Logo

সাহিত্য সংস্কৃতি    >>   আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস—ডক্টর সবিতা দাস

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস—ডক্টর সবিতা দাস

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস—ডক্টর সবিতা দাস

সবিতা দাস (বুলু):
২১ ফেব্রুয়ারি আসে মায়ের মুখের বাণী, মায়ের হাসির অনুভব ও মায়ের কোলের শীতল স্পর্শ নিয়ে।
২১ ফেব্রুয়ারি—এটি কেবল একটি দিন নয়; এটি আমাদের জাতীয় চেতনার অবিনাশী চিরন্তন প্রতীক, মাতৃভাষার জন্য বাঙালির প্রথম রক্তস্নাত স্বাধিকারের ইতিহাস।
ফেব্রুয়ারি ভাষার মাস, আবেগের মাস, গৌরবের মাস। মায়ের ভাষায় কথা বলার মাস। এই মাসের প্রতিটি দিন করুণ রক্তে রঞ্জিত, প্রতিটি স্মৃতি বাঙালির আত্মদানের অনির্বাণ কাহিনি বহন করে—মায়ের মুখের ভাষার জন্য।
আমাদের এই অমর একুশে ফেব্রুয়ারি কেবল একটি তারিখ নয়, এটি একটি জাতির চেতনার প্রতীক।
১৯৫২ সালের সেই শোকাবহ ভোররাতে, যখন মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ছাত্র-জনতার অকুতোভয় কণ্ঠ গর্জে উঠেছিল, তখন রাষ্ট্রশক্তি সেই কণ্ঠরোধ করতে চেয়েছিল সীসা-গলানো গুলিতে। চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল হানাহানি আর বারুদের গন্ধ।
রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার—নাম না-জানা আরও কত তরুণের প্রাণের বিনিময়ে রাজপথ অঙ্কিত হয়েছিল।
তাদের রক্তস্রোত কোনো ধ্বংসের ইতিহাস নয়; বরং তা ছিল সৃষ্টির সোপান—একটি ভাষার, একটি জাতির মুক্তির সনদ। সেই রক্তের অক্ষরেই লেখা হয়েছিল আমাদের স্বাধীন সত্তার প্রথম অধিকার—মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার।
এই ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়।
এই ভাষা আমাদের মায়ের আদরের ডাক, ছড়ার মজা, কবিতার ছন্দ, গানের সুর। এই ভাষায় মিশে আছে নদীর কুলুকুলু ধ্বনি, আমের মুকুলের গন্ধ, বর্ষার প্রথম ফোঁটার স্পর্শ। একটি শিশু যখন “মা” বলে ডাকে, তখন সে তার সমগ্র সত্তা দিয়ে অনুভব করে সেই শব্দের মাধুর্য—যে শব্দের জন্ম তার মাটি ও নক্ষত্রের কাছ থেকে।
মায়ের মুখের ভাষা তাই শুধু শব্দের সমষ্টি নয়; এটি আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, ইতিহাসের ধারক এবং জাতীয় অস্তিত্বের ভিত্তিপ্রস্তর।
এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।
বাংলাদেশের ভাষা শহীদদের আত্মদান কেবল এই দেশের সীমানায় আবদ্ধ থাকেনি; তা বিশ্বজুড়ে সব নিপীড়িত মানুষের মাতৃভাষা রক্ষার সংগ্রামের অনুপ্রেরণায় পরিণত হয়েছে। ইউনেস্কোর স্বীকৃতিতে ২১ ফেব্রুয়ারি আজ বিশ্বব্যাপী পালিত হয়।
এই স্বীকৃতি শুধু আমাদের গর্বের বিষয় নয়; এটি বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দেয়—ভাষার বৈচিত্র্য মানবসভ্যতার অমূল্য সম্পদ, যা সংরক্ষণ, চর্চা ও লালন করা আমাদের সবার আন্তরিক দায়িত্ব।
ফেব্রুয়ারি তাই আমাদের কাছে মাসব্যাপী এক পূর্ণ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
শহীদ মিনারের বেদীতে সাদা ফুলের শ্রদ্ধাঞ্জলি, অশ্রুসিক্ত চোখে উচ্চারিত—
“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি!”
বইমেলায় নতুন চিন্তার বিকাশ—সব মিলিয়ে এক মহান সাংস্কৃতিক জাগরণ।
এটি আমাদের বার্ষিক আত্মসমালোচনারও সময়।
আমরা কি আমাদের ভাষার শুদ্ধতা রক্ষা করছি?
আমরা কি জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সৃজনশীলতায় ভাষাকে সমৃদ্ধ করছি?
আমরা কি ভাষা শহীদদের স্বপ্ন ধারণ করে চলেছি?
ভাষা শহীদরা আমাদের শিখিয়ে গেছেন—মাতৃভাষা কোনো দান নয়, এটি আমাদের অধিকার। আর অধিকার আদায়ে প্রয়োজনে প্রাণও দিতে হয়। তাদের সেই অমর বলিদান আমাদের চিরদিনের দায়িত্বের দিকনির্দেশনা দেয়।
ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি তাই কেবল শোকের নয়—এটি আত্মঅঙ্গীকারের মাস।
মায়ের মুখের মধুর ভাষাকে যেন আমরা ভুলে না যাই, বিকৃত না করি, তুচ্ছ না করি—এই প্রতিজ্ঞাই হোক আমাদের চিরন্তন অঙ্গীকার।
কারণ এই ভাষাই আমাদের “আমি” বলতে শেখায়, “মা” ডাকতে শেখায়।
আমাদের মাতৃভাষা, আমাদের বাংলা—আমাদের স্বরূপের আয়না।
এই আয়নায় চিরভাস্বর থাকবে একুশের অমর শহীদরা, যাদের ত্যাগের মহিমায় আজ বিশ্বজুড়ে মাতৃভাষার মর্যাদা উচ্চারিত হয় সাহস, বিশ্বাস, আত্মমর্যাদা ও গর্বের সঙ্গে।
উল্লেখ্য, ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে, যা ২০০০ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে।
সবশেষে সকল ভাষা সৈনিক ও ভাষা শহীদের স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।
ডক্টর সবিতা দাস, কলামিস্ট ও সংগঠক নিউইয়র্ক।