Logo

সাহিত্য সংস্কৃতি    >>   নারীর অগ্রযাত্রায় সকল প্রতিবন্ধকতা কাটুক

নারীর অগ্রযাত্রায় সকল প্রতিবন্ধকতা কাটুক

নারীর অগ্রযাত্রায় সকল প্রতিবন্ধকতা কাটুক

প্রাইমা হোসাইন:
সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নের অন্যতম প্রধান শক্তি নারী। ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে নারীর অবদান রয়েছে, যদিও বহু সময় সেই অবদান যথাযথভাবে স্বীকৃতি পায়নি। আজকের বিশ্বে নারীরা শিক্ষা, অর্থনীতি, রাজনীতি, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তবুও নারীর অগ্রযাত্রার পথে এখনও নানা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে। একটি উন্নত ও সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করা অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশের অগ্রগতি কিংবা অর্থনৈতিক উন্নয়নের পেছনে অন্যতম বড় শক্তি হলো নারীসমাজ এবং তাদের শ্রম। একসময় ঘরের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ থাকা নারীরা সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আজ দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। গার্মেন্টস শিল্প থেকে শুরু করে কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যাংক-বীমা এবং তথ্যপ্রযুক্তি—সব ক্ষেত্রেই নারীদের অংশগ্রহণ দৃশ্যমান। তবে দুঃখজনক সত্য হলো, জাতীয় আয়ে নারীর শ্রমের অবদান এখনও যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয় না। পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র—এই তিন স্তরেই নারীর শ্রম অনেক ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার। দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের চিত্রে নারীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা অনেক সময় স্বীকৃতি ও প্রাপ্য মর্যাদা থেকে বঞ্চিত থাকে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারীর অগ্রগতি সত্যিই উল্লেখযোগ্য। শিক্ষাক্ষেত্রে মেয়েদের অংশগ্রহণ বেড়েছে, কর্মক্ষেত্রে নারীর উপস্থিতি দৃশ্যমান হয়েছে, এমনকি রাষ্ট্র পরিচালনার উচ্চ পর্যায়েও নারীরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তৈরি পোশাক শিল্প থেকে শুরু করে কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রশাসন—সবখানেই নারীর সক্রিয় ভূমিকা দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে। প্রবাসেও বহু বাংলাদেশি নারী দক্ষতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছেন।
তবে এত সাফল্যের মধ্যেও সবচেয়ে বড় অবহেলার জায়গা হলো ঘরের ভেতরে নারীদের শ্রমের মূল্যায়ন। রান্না, সন্তান লালনপালন, বয়স্কদের সেবা এবং গৃহস্থালির নানা কাজ দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অপরিহার্য অংশ। যদি এসব কাজ বাজারমূল্যে হিসাব করা হতো, তাহলে জাতীয় আয়ের পরিসংখ্যানে নারীর অবদান আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেত। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, গৃহস্থালির কাজকে অর্থনৈতিক অবদান হিসেবে গণনা করলে অনেক দেশের জিডিপি কয়েক শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। অথচ বাংলাদেশে এখনও এসব শ্রমকে অদৃশ্য শ্রম হিসেবে দেখা হয়, কারণ এর বিনিময়ে নারীরা কোনো অর্থনৈতিক স্বীকৃতি পান না।
বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র তৈরি পোশাক শিল্প, যেখানে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন এবং এর মধ্যে প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশই নারী। এই খাত থেকে বছরে যে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আসে, তার বড় অংশই নারী শ্রমিকদের অবদানের ফল। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন থেকেই যায়—এই শ্রমিকরা কি ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা পাচ্ছেন? বাস্তবতা হলো, অনেক নারী শ্রমিক এখনও বেতন বৈষম্য, হয়রানি এবং স্বাস্থ্যঝুঁকির শিকার।
কৃষি খাতেও নারীর অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বীজ বপন, চারা রোপণ, ফসল কাটা—নানা কৃষিকাজে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু সরকারি পরিসংখ্যানে তাদের অনেক সময় কৃষিশ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। গ্রামীণ সমাজে নারীরা প্রায়ই ‘সহযোগী’ হিসেবে পরিচিত থাকেন, প্রকৃত কৃষক হিসেবে নয়। ফলে নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় তাদের দাবি-দাওয়াও যথাযথ গুরুত্ব পায় না।
এছাড়া নারীরা এখনও নানা ধরনের সামাজিক বৈষম্য ও বাধার মুখোমুখি হন। সামাজিক কুসংস্কার, নিরাপত্তাহীনতা, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, বাল্যবিবাহ এবং পারিবারিক সহিংসতা অনেক নারীর স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করে। অনেক ক্ষেত্রে সমান কাজ করেও নারীরা সমান মর্যাদা বা সুযোগ পান না। গ্রামাঞ্চলে শিক্ষার সুযোগ সীমিত হওয়া এবং দারিদ্র্যের কারণে বহু মেধাবী মেয়ে তাদের শিক্ষা বা কর্মজীবন এগিয়ে নিতে পারে না।
নারীর অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র—সব স্তরে নারীর প্রতি সম্মান ও সমতার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে হবে। মেয়েদের শিক্ষা নিশ্চিত করা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরি করা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে নারীর অধিকার রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে নারীদেরও আত্মবিশ্বাসী, সচেতন ও স্বনির্ভর হয়ে উঠতে হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে। আফ্রিকার কিছু দেশে মোবাইল মানির প্রসার নারীদের আয়ের ধারাকে মূলধারায় নিয়ে এসেছে। আগে যেখানে নারীরা ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে ছিলেন, এখন মোবাইল মানির মাধ্যমে তারা লেনদেন, সঞ্চয় এবং বিনিয়োগ করতে পারছেন। ভারতের নারী উদ্যোক্তা গ্রুপভিত্তিক ঋণ ব্যবস্থা পুনঃপরিশোধের ক্ষেত্রে আশ্চর্যজনক সাফল্য দেখিয়েছে। কেনিয়াতে এম-পেসার মতো মোবাইল ফিনটেক প্ল্যাটফর্ম নারীদের ক্ষুদ্র ব্যবসায় মূলধন সংগ্রহ সহজ করেছে। ইথিওপিয়াতে নারীকেন্দ্রিক ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো কৃষি খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়িয়েছে এবং রুয়ান্ডায় নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ ও বাজারসংযোগ কর্মসূচি চালু করা হয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এসব মডেল কার্যকর হতে পারে। বিশেষ করে নারীদের ক্লাস্টারভিত্তিক অর্থায়ন, ডিজিটাল আর্থিক সাক্ষরতা বৃদ্ধি এবং মোবাইলভিত্তিক আর্থিক সেবা সম্প্রসারণ নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
সরকার ইতোমধ্যে নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ সুবিধা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং নারী শিক্ষায় বিশেষ উদ্যোগ ইতিবাচক ফল দিচ্ছে। তবে এসব উদ্যোগকে আরও কার্যকর ও বিস্তৃত করতে হবে, যাতে সমাজের প্রতিটি নারী তার সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পায়।
একটি দেশের অগ্রগতি কখনোই পূর্ণতা পায় না, যদি তার অর্ধেক জনগোষ্ঠী পিছিয়ে থাকে। তাই নারীর অগ্রযাত্রা কেবল নারীর বিষয় নয়; এটি জাতির সামগ্রিক উন্নয়নের প্রশ্ন। আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এমন একটি সমাজ গড়ে উঠুক, যেখানে নারী-পুরুষ সমান মর্যাদা ও সুযোগ নিয়ে এগিয়ে যেতে পারে।
মনে রাখতে হবে—নারী সমাজের উন্নয়ন মানেই দেশের উন্নয়ন। তাই রাষ্ট্র ও সমাজকে নারীর প্রতি আরও দায়িত্বশীল হতে হবে এবং উন্নয়নের মূলধারায় তাদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণই হবে আগামীর স্বপ্নের বাংলাদেশ। নারীর পথের সব প্রতিবন্ধকতা দূর হোক—এই প্রত্যাশাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

প্রাইমা হোসাইন, সমাজসেবিকা ও সংগঠক