Logo

আন্তর্জাতিক    >>   ২৫ মার্চ: রক্তাক্ত স্মৃতি যেন অম্লান থাকে

২৫ মার্চ: রক্তাক্ত স্মৃতি যেন অম্লান থাকে

২৫ মার্চ: রক্তাক্ত স্মৃতি যেন অম্লান থাকে

আ. ফ. ম. বাহাউদ্দিন নাছিম:

আজ ২৫ মার্চ—বাংলাদেশের ইতিহাসে এক শোকাবহ, বিভীষিকাময় দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনটির মধ্যরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর চালায় নির্মম গণহত্যা। সেই কালরাত্রি আজও বাঙালির চেতনায় জেগে আছে এক অমোচনীয় ক্ষত হিসেবে।
ঢাকার রাজপথ থেকে শুরু করে গ্রাম-গঞ্জ—সবখানেই রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল আমাদের মাতৃভূমি। ঘুমন্ত মানুষকে গুলি করে হত্যা, শিক্ষার্থীদের ওপর বর্বর হামলা, নিরীহ পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া—সব মিলিয়ে এটি ছিল একটি জাতিকে মুছে ফেলার পরিকল্পিত প্রয়াস। সেই কারণেই ২৫ মার্চ আজ ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে জাতির হৃদয়ে অম্লান হয়ে আছে।
দীর্ঘ সময় ধরে নানা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে এই দিনের স্বীকৃতি বাধাগ্রস্ত হলেও, ২০১৭ সালের ১১ মার্চ জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে ২৫ মার্চকে ‘জাতীয় গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। এরপর থেকে রাষ্ট্রীয়ভাবে দিনটি পালিত হয়ে আসছে, যা ইতিহাসের প্রতি জাতির দায়বদ্ধতারই বহিঃপ্রকাশ।
তবে দুঃখজনকভাবে, বিভিন্ন সময়ে কিছু সিদ্ধান্ত ও প্রবণতা এই দিবসের মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে। ইতিহাসকে আড়াল করা বা বিকৃত করার এই প্রবণতা জাতির জন্য অশনিসংকেত। কারণ ইতিহাস কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে মুছে যায় না; একটি জাতির রক্ত, বেদনা ও আত্মত্যাগ কখনো বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যেতে পারে না।
২৫ মার্চ শুধু একটি দিন নয়—এটি আমাদের অস্তিত্বের অংশ, আমাদের চেতনার ভিত্তি। এই দিনটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় স্বাধীনতার মূল্য, শহীদদের ত্যাগ, এবং জাতি হিসেবে আমাদের সংগ্রামের ইতিহাস।
বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে—অন্যায়, বৈষম্য ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে। সেই প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতার চেতনাবিরোধী যেকোনো কর্মকাণ্ড, ইতিহাসবিরোধী যেকোনো প্রচেষ্টা আমাদের জাতীয় পরিচয়কে প্রশ্নের মুখে ফেলে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ১৯৭১ সালে ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে পাকিস্তানি বাহিনী পরিকল্পিতভাবে বাঙালি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা চালায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ঢুকে শিক্ষার্থীদের হত্যা, বুদ্ধিজীবীদের নিধন, নিরীহ মানুষের ওপর নির্বিচার গুলি—সবই ছিল একটি সুপরিকল্পিত গণহত্যার অংশ।
দুঃখজনকভাবে, সেই সময় এদেশের কিছু দোসর শক্তিও হানাদার বাহিনীর সহযোগী হয়ে উঠেছিল। তারা মানবতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নিজেদের জাতির বিরুদ্ধেই অপরাধে লিপ্ত হয়েছিল। ইতিহাসে তাদের ভূমিকা চিরকাল ঘৃণিত হয়ে থাকবে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের সতর্ক থাকা জরুরি—যেন ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি না ঘটে, যেন বিভ্রান্তি ও অপপ্রচারের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে বিপথগামী করা না হয়। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, ১৯৭১ সালের গণহত্যা ছিল রাষ্ট্র পরিচালিত পরিকল্পিত জাতিগত নিধন—যার তুলনা অন্য কোনো সময়ের ঘটনার সঙ্গে করা সহজ নয়।
আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি আমাদের স্মৃতি। আমরা ভুলে যাইনি ২৫ মার্চের সেই কালরাত্রি, ভুলে যাইনি মুক্তিযুদ্ধের আত্মত্যাগ। এই স্মৃতিই আমাদের শক্তি, এই স্মৃতিই আমাদের প্রেরণা।
আজকের প্রজন্মের কাছে আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব—ইতিহাসকে সত্যভাবে তুলে ধরা। যেন তারা বুঝতে পারে, কত ত্যাগের বিনিময়ে এই স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। যেন তারা কোনো বিভ্রান্তি বা অপপ্রচারে প্রভাবিত না হয়।
ইতিহাস আমাদের শেখায়—অন্ধকার যত গভীরই হোক, আলো ফিরে আসে। কিন্তু সেই আলো ফিরিয়ে আনতে হলে আমাদের সচেতন থাকতে হবে, ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে এবং মানবতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে।
আজকের দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক—
আমরা ইতিহাসকে স্মরণ করব,
শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাব,
এবং কোনো শক্তিকে আমাদের ইতিহাস বিকৃত করতে দেব না।
২৫ মার্চের রক্তাক্ত স্মৃতি চিরজাগরুক থাকুক বাঙালির হৃদয়ে।
আ. ফ. ম. বাহাউদ্দিন নাছিম, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ