Logo

রাজনীতি    >>   গণভোটে ‘হ্যাঁ’ প্রচারে সরকারের ভূমিকা: আদৌ কী যুক্তিসঙ্গত?

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ প্রচারে সরকারের ভূমিকা: আদৌ কী যুক্তিসঙ্গত?

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ প্রচারে সরকারের ভূমিকা: আদৌ কী যুক্তিসঙ্গত?

এম এ আলীম সরকার:
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত তিনবার গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। যথাক্রমে ১৯৭৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর জেনারেল জিয়াউর রহমানের আমলে, ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে এবং ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সময়ে। এই তিনটি গণভোটেই জনগণ একটি নির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তরে সরাসরি ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। অর্থাৎ গণভোটের মৌলিক বৈশিষ্ট্য—একটি প্রশ্নে জনগণের সরাসরি সম্মতি বা অসম্মতি—সব ক্ষেত্রেই বজায় ছিল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে সংস্কার কমিশন গঠন করেন। কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য ‘জুলাই সনদ’ প্রণীত হয়, যেখানে মোট ৮৪টি প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মতভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও ২৫টি রাজনৈতিক দল এই সনদে স্বাক্ষর করে। প্রথমদিকে প্রস্তাব ছিল—যেসব বিষয়ে কোনো দল ভিন্নমত পোষণ করবে, তারা ক্ষমতায় গেলে সেসব সংস্কার বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে না। কিন্তু এ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব না হওয়ায় সরকার শেষ পর্যন্ত গণভোটের পথ বেছে নেয়।
এরই ধারাবাহিকতায় প্রধান উপদেষ্টা একযোগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের ঘোষণা দেন, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের ঘটনা বিশ্ব ইতিহাসেও বিরল। এবারের গণভোট পূর্ববর্তী সব গণভোট থেকে মৌলিকভাবে আলাদা। কারণ এখানে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবকে চারটি সংক্ষিপ্ত বিষয়ের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে ভোটারদের একটি মাত্র ব্যালটে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দিতে বলা হচ্ছে।
এই ৮৪টি প্রস্তাবের মধ্যে ৪৭টি সংবিধান সংশোধনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত এবং অবশিষ্ট ৩৭টি সাধারণ আইন, অধ্যাদেশ কিংবা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। অথচ এসব প্রস্তাবের অনেকগুলো নিয়েই বিএনপিসহ একাধিক রাজনৈতিক দল ভিন্নমত জানিয়েছে। প্রশ্ন হলো, দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ যেখানে চারটি বিষয়ের প্রকৃত অর্থ ও প্রভাব সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণাই রাখেন না, সেখানে তারা কীভাবে সচেতনভাবে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেবেন। যদি কোনো ভোটার চারটির মধ্যে দুটিতে একমত এবং দুটিতে অসম্মত হন, তবে তিনি কোথায় ভোট দেবেন। আবার এমনও হতে পারে, কোনো ভোটারের চারটি বিষয় নিয়েই সুস্পষ্ট মত নেই। এই বাস্তবতায় এ ধরনের ভোট আয়োজন প্রকৃত অর্থে গণভোটের সংজ্ঞার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
গণভোটের মূল ধারণা হলো একটি নির্দিষ্ট প্রশ্নে জনগণের সরাসরি মতামত গ্রহণ। একাধিক জটিল ও বহুমাত্রিক বিষয়ের ওপর একসঙ্গে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ চাপিয়ে দেওয়া গণভোটের চেতনার পরিপন্থী। আমাদের দেশে প্রকৃত রাজনীতি ও নেতৃত্বের দীর্ঘদিনের শূন্যতার ফলেই এমন এক গোঁজামিলপূর্ণ গণভোট জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই রাজনৈতিক সংকটের মূল দায় ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের, যারা গত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন কার্যত ভোটারবিহীনভাবে আয়োজন করেছে।
ফলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একইদিনে অনুষ্ঠিত হওয়ার ঘোষণায় জনগণের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা দেখা যাচ্ছে না। বরং অধিকাংশ প্রার্থী নিজের নির্বাচনী প্রচারণার চেয়ে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারে বেশি মনোযোগী। একমাত্র জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের প্রকাশ্যে ‘না’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। দেশের রাজনৈতিক দুর্দিনে তার এই অবস্থান নিঃসন্দেহে সাহসী এবং ব্যতিক্রমী।
অন্যদিকে প্রধান উপদেষ্টা থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা যেভাবে প্রকাশ্যে গণভোটের ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন, তা গণভোটের নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। এই প্রচার অনেকটাই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মতো আচরণে পরিণত হয়েছে, যা গণতান্ত্রিক রীতিনীতির সঙ্গে অসংগত।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি উদ্বেগজনক। গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ধারা ২১ এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর অনুচ্ছেদ ৮৬ অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রে নিয়োজিত কোনো কর্মকর্তা ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর পক্ষে প্রচার চালালে তা দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। ধারা ২১ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেসব কার্য অপরাধ বা আচরণবিধি লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য, সেসব একইভাবে গণভোটের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এসব আইনি বিধান কার্যত উপেক্ষিত হচ্ছে। দেশে আইন আছে, কিন্তু আইনের প্রয়োগ নেই—এটাই আমাদের বড় দুর্ভাগ্য।
গণভোট গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। সংবিধানের মৌলিক কাঠামো কিংবা দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে জনগণের সরাসরি মতামত গ্রহণ এর মূল উদ্দেশ্য। গণতান্ত্রিক তত্ত্ব অনুযায়ী সরকার জনগণের প্রতিনিধি হওয়ায় গণভোটের প্রয়োজনীয়তা, উদ্দেশ্য এবং ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ জয়ী হলে রাষ্ট্র কোন পথে যাবে—সে বিষয়ে জনগণকে তথ্য ও ব্যাখ্যা দেওয়ার অধিকার ও দায়িত্ব সরকারের রয়েছে। কিন্তু এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সরকার যদি রাষ্ট্রীয় অর্থ, প্রশাসন ও সরকারি যন্ত্র ব্যবহার করে একতরফা প্রচার চালায়, তাহলে গণভোট আর স্বাধীন ও নিরপেক্ষ থাকে না।
যুক্তরাজ্য বা কানাডার মতো গণতান্ত্রিক দেশে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের অবস্থান জানালেও একটি স্পষ্ট সীমারেখা মানা হয়—তথ্যভিত্তিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, কিন্তু প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহার করে প্রচার চালানো হয় না। ব্রেক্সিট গণভোটে সরকারি প্রচারের সীমা নিয়ে যে বিতর্ক ও আদালতের হস্তক্ষেপ হয়েছিল, তা আমাদের জন্য বড় শিক্ষা হতে পারে।
গণভোটের প্রধান শর্ত হলো ভোটার যেন ভয়, চাপ বা প্রভাব ছাড়া স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সরকার যখন প্রকাশ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের আহ্বান জানায় এবং ভিন্নমতকে অযৌক্তিক বা রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে উপস্থাপন করে, তখন সাধারণ মানুষের স্বাধীন মত প্রকাশ গুরুতরভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। সরকারের সম্পূর্ণ নীরবতা যেমন কাম্য নয়, তেমনি একতরফা প্রচারও গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক। জনগণ যেন স্বাধীনভাবে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে—এমন পরিবেশ সৃষ্টি করাই সরকারের মূল দায়িত্ব হওয়া উচিত।
এম এ আলীম সরকার, প্রাবন্ধিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সভাপতি, বাংলাদেশ গণমুক্তি পার্টি (বিজিপি)