Logo

সাহিত্য সংস্কৃতি    >>   প্রবাসে ২৫ বছরের সংস্কৃতি সাধনা: নিউইয়র্কে ‘বহ্নিশিখা’র রজতজয়ন্তী উৎসবে বাংলাদেশের ঐতিহ্যের দীপ্ত পুনরুজ্জীবন

প্রবাসে ২৫ বছরের সংস্কৃতি সাধনা: নিউইয়র্কে ‘বহ্নিশিখা’র  রজতজয়ন্তী উৎসবে বাংলাদেশের ঐতিহ্যের দীপ্ত পুনরুজ্জীবন

প্রবাসে ২৫ বছরের সংস্কৃতি সাধনা: নিউইয়র্কে ‘বহ্নিশিখা’র রজতজয়ন্তী উৎসবে বাংলাদেশের ঐতিহ্যের দীপ্ত পুনরুজ্জীবন

প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক :

বাংলাদেশের ভাষা, সাহিত্য, সংগীত ও সংস্কৃতির প্রাণধারা বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়ার নিরলস প্রয়াসের নাম ‘বহ্নিশিখা সঙ্গীত নিকেতন’। নিউইয়র্কে প্রবাসী বাঙালিদের হৃদয়ে শেকড় গাড়া এই সংগঠনটি উদযাপন করল তাদের গৌরবোজ্জ্বল ২৫ বছর পূর্তি। নিউইয়র্ক সিটির কুইন্স প্যালেস মিলনায়তনে ২৭ এপ্রিল এক জমকালো ‘রজতজয়ন্তী’ আয়োজনের মধ্য দিয়ে এ ঐতিহাসিক মুহূর্ত উদযাপিত হয়, যেখানে সুর, ছন্দ, আবৃত্তি, কথন আর ভালোবাসা মিলেমিশে সৃষ্টি হয় এক অবিস্মরণীয় সন্ধ্যা।

অনুষ্ঠানের সূচনা হয় বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ৩০ লাখ বীরের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে। নীরবতা পালন ও দুই দেশের জাতীয় সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এ আয়োজনে আবেগ ছড়িয়ে পড়ে পুরো মিলনায়তনে। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন মুনমুন সাহা।

‘বহ্নিশিখা’র শিল্পীরা সমবেত কণ্ঠে পরিবেশন করেন ‘আগুনের পরশমনি ছোঁয়াও প্রাণে’ ও ‘এসো হে বৈশাখ’, যার মধ্য দিয়ে বাংলা নববর্ষকে বরণ করে নেওয়া হয়। শুধু নববর্ষ নয়, বহ্নিশিখা প্রতি বছর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, মহান স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, পহেলা ফাল্গুন, বৈশাখী উৎসব, মা দিবস, বাবা দিবস, শহীদ দিবসসহ বাংলাদেশের সকল জাতীয় ও ঐতিহাসিক দিবস অত্যন্ত মর্যাদার সাথে পালন করে আসছে। প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের মাঝে বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য গেঁথে দেয়ার জন্য এ আয়োজনগুলির গুরুত্ব অপরিসীম।

নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলীম্যান স্টিভেন রাঘারের প্রতিনিধি কাজী মরিয়ম এদিন ‘বহ্নিশিখা’ সংগঠনকে সম্মানসূচক সাইটেশন প্রদান করেন। এতে বহ্নিশিখার দুই যুগের নিরলস প্রচেষ্টার স্বীকৃতি হিসেবে সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা, প্রেসিডেন্ট ও সিইও ড. সবিতা দাসকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়। ফুল, শুভেচ্ছা বার্তা আর অভিনন্দনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র মিলনায়তনে।

এছাড়া সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ছিল গান, নাচ, আবৃত্তি ও কথকতার এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশনায় মঞ্চ মাতিয়ে তোলেন বহ্নিশিখার শিল্পীরা। পরিবেশনায় অংশ নেন রুনা রয়, শাকিলা রুনা, ডা. রুমা চৌধুরী, সৌভিথ চৌধুরী, অরুনা সাহা, সুস্মিতা হালদার, পারিজাত দাস, শিলা চন্দ্র, সুশীল সিনহা, চন্দনা ভট্টাচার্য, সৈয়দ আহমদ বাবলা, ফারজিন স্বর্ণা, অনুষ্কা সেনগুপ্ত, ডা. কামরুল ইসলাম, সোমা রোজারিয়ো, ইমন বিশ্বাস, জুলি খাস্তগীর, মুনমুন সাহা, দীপক দাস, আয়েশা খান, প্রদীপ কুন্ডু, কুমার স্মিতা ,অঙ্কিতা বিশ্বাস, অথরা ঘোষ, সুদেষ্ণা সাহা, অস্মিতা মন্ডল, অনামিকা চন্দ, রায়াশি বিশ্বাস, মিথি বড়ুয়া, পূর্ণ চৌধুরী, সপ্তর্ষী বণিক, পূজা দাস, প্রিণা নন্দী, সৃজিতা হিয়া ও উইলি নন্দি। পুরো অনুষ্ঠানটির নির্দেশনা দেন ড. সবিতা দাস নিজে।

মিলনায়তনে বসানো হয় বিভিন্ন সেবামূলক কর্মকাণ্ডের স্টল, যা এই আয়োজনকে শুধু সাংস্কৃতিক নয়, সামাজিক যোগাযোগের এক বৃহৎ প্ল্যাটফর্মে পরিণত করে। সমাপ্তির প্রাক্কালে পিঠা-পুলিসহ নানা দেশি খাবারের মাধ্যমে অতিথিদের আপ্যায়ন করা হয়, যার মধ্য দিয়ে বাঙালিয়ানার আবহ আরও ঘন হয়ে ওঠে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা লাবলু আনসার, ইউনাইটেড হিন্দুস অফ ইউএসএ এর চেয়ারম্যান ডা. প্রভাত দাস , মুক্তিযোদ্ধা আবুল বাশার চুন্নু, বিজ্ঞানী ও লেখক ড. ধনঞ্জয় সাহা, অধ্যাপক নবেন্দু দত্ত, কমিউনিটি লিডার মোহাম্মদ ফারুক আহমেদ, রওশন আরা ফারুক, জসিম চৌধুরী, ইউনাইটেড হিন্দুস অফ ইউএসএ এর সভাপতি ভজন সরকার, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও কমিউনিটির লিডার বিষ্ণু গোপ , ডাক্তার মিতা চৌধুরী, ডাক্তার গোবিন্দ পাল , ইউনাইটেড হিন্দুস অফ ইউএসএ এর সাধারণ সম্পাদক রামদাস ঘরামি,সাংবাদিক সাখাওয়াত হোসেন সেলিম, প্রজ্ঞা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও প্রজ্ঞা নিউজের সম্পাদক উত্তম কুমার সাহা এবং সাংস্কৃতিক সংগঠক সাবিনা হাই উর্বি।

বক্তারা বলেন, “ড. সবিতা দাসের ধৈর্য, নিষ্ঠা ও প্রজ্ঞার মিশ্রণে বহ্নিশিখা আজ প্রবাসী বাঙালিদের হৃদয়ের গভীরে একটি বিশেষ আসন গড়ে নিয়েছে।”

অনুষ্ঠানের শেষাংশে ড. সবিতা দাস সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, “প্রতিটি নববর্ষ নতুন সম্ভাবনার আহ্বান জানায়। আমরা পুরনো দুঃখ-ক্লান্তি আর গ্লানিকে পিছনে ফেলে সম্ভাবনার পথে এগিয়ে যেতে চাই। সংস্কৃতি, মানবতা ও ঐতিহ্যের শক্তিতে গড়ে উঠুক আমাদের সুন্দর আগামী। এই বহুজাতিক সমাজেও আমরা গর্বের সাথে বয়ে চলবো বাংলাদেশের প্রাণস্পন্দন।”

প্রবাসে বাংলাদেশের সংস্কৃতি সংরক্ষণ, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তার চেতনা ও গৌরব ছড়িয়ে দেয়ার যে দীপ্ত প্রতিশ্রুতি বহ্নিশিখা ও ড. সবিতা দাস নিয়ে চলেছেন—এই রজতজয়ন্তী উৎসব তার এক ঐতিহাসিক উদাহরণ। এটি নিঃসন্দেহে প্রবাসে বসবাসরত নতুন ও পুরাতন বাঙালিদের মধ্যে এক অবিনশ্বর সাংস্কৃতিক বন্ধনের সেতুবন্ধন রচনা করেছে।

ড. সবিতা দাস তাঁর বক্তব্যে আরও বলেন,“বৈশাখ মানেই নতুন সম্ভাবনার আহ্বান। জীবন হোক শান্তিময়, মর্যাদাপূর্ণ এবং উন্নতির দীপ্ত পথে উদ্ভাসিত। সংস্কৃতি আর মানবতার শক্তিতে গড়ে উঠুক আমাদের আগামী। বহ্নিশিখা থাকবে প্রবাসের মাটিতে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হয়ে।” উপস্থিত সবাইকে তিনি  ভবিষ্যতেও ‘বহ্নিশিখা’র পাশে থাকার আহ্বান জানান।

প্রবাসে প্রজন্মের পর প্রজন্মের মধ্যে বাংলাদেশী সংস্কৃতি, ভাষা, ইতিহাস ছড়িয়ে দিতে বহ্নিশিখার ২৫ বছরের অবদান অনস্বীকার্য। নিউইয়র্কের বুকে এই রজতজয়ন্তী উদযাপন এক নতুন প্রত্যয়ের জন্ম দিল— বাংলাদেশের মাটি, মানুষের চেতনা আর সংস্কৃতির উত্তরাধিকার প্রবাসেও অম্লান থাকবে।