Logo

সাহিত্য সংস্কৃতি    >>   প্রবাসে দুর্গাপূজা: স্মৃতি থেকে আজকের নিউইয়র্ক

প্রবাসে দুর্গাপূজা: স্মৃতি থেকে আজকের নিউইয়র্ক

প্রবাসে দুর্গাপূজা: স্মৃতি থেকে আজকের নিউইয়র্ক

কাবেরী দাশ:
১৯৯৭ সালের সেপ্টেম্বর। স্বপরিবারে ইমিগ্রান্ট হয়ে নিউইয়র্কে এসে স্থায়ী আবাস গড়ে তুলি। নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ, নতুন জীবন—সবকিছুই তখন অপরিচিত। কিন্তু প্রবাসজীবনের সেই শুরুর দিনেই দুর্গাপূজা আমাকে যেন আবার নিজের শিকড়ের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছিল।

১৯৯৭ সালেই নিউইয়র্কে আমার প্রথম দুর্গাপূজা। কার্পাস কৃষ্টি চার্চে অনুষ্ঠিত সেই পূজায় প্রথমবারের মতো একক সংগীত পরিবেশনের সুযোগ পাই। নতুন দেশে সেটিই ছিল আমার প্রথম সাংস্কৃতিক পরিবেশনা।

আজ এত বছর পরও সেই মুহূর্তটি স্পষ্ট মনে পড়ে। একক সংগীতের শুরু করেছিলাম শ্যামাসংগীত—

“মনেরই বাসনা, শ্যামা স্ববাসনা,
শোন মা, বলি…”

নতুন শহরে দাঁড়িয়ে মায়ের গান গাওয়ার সেই অনুভূতি ছিল অন্যরকম। কণ্ঠে ছিল গান, আর মনের ভেতর তখনও জীবন্ত ছিল ফেলে আসা দেশ। মনে হয়েছিল, নিউইয়র্কের মাটিতেও যেন বাংলার সঙ্গে আমার একটি অদৃশ্য যোগসূত্র তৈরি হলো।

সেই প্রথম পরিবেশনার পর দুর্গাপূজার সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা আরও গভীর হয়। পূজার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশনের জন্য আমন্ত্রণ পেয়েছি। পরিবারের সবাইকে সঙ্গে নিয়ে পূজায় যাওয়া, পরিচিতদের সঙ্গে দেখা হওয়া, নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয়—সব মিলিয়ে পূজা হয়ে উঠেছিল প্রবাসজীবনের এক আনন্দময় সামাজিক মিলনক্ষেত্র।

তখন নিউইয়র্কে দুর্গাপূজার আয়োজন ছিল অনেক সীমিত। আজকের মতো এত সংগঠন, এত মন্দির এবং এতগুলো পূজার আয়োজন ছিল না। সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলে গেছে। নিউইয়র্কের বিভিন্ন প্রান্তে এখন অসংখ্য সংগঠন ও মন্দিরের উদ্যোগে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন আয়োজনের কারণে দীর্ঘ সময় ধরে বাঙালি সমাজে পূজার উৎসবের আবহ বিরাজ করে।

এই পরিবর্তন আনন্দের। কারণ প্রতিটি পূজাই শুধু ধর্মীয় আচার নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলা ভাষা, সংগীত, সংস্কৃতি, সামাজিক বন্ধন এবং নতুন প্রজন্মকে নিজেদের ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সুযোগ।

প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের জন্য এই বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তারা হয়তো বাংলাদেশের শরতের কাশফুল দেখেনি, গ্রামের পূজামণ্ডপে যায়নি কিংবা কলকাতা বা ঢাকার পূজার অভিজ্ঞতা তাদের নেই। কিন্তু নিউইয়র্কের পূজামণ্ডপে এসে তারা বাংলা গান শুনতে পারে, বাংলা ভাষার মানুষের সঙ্গে মিশতে পারে এবং নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে।

তবে আমার একটি ব্যক্তিগত প্রত্যাশা আছে—পূজামণ্ডপে পূজার গান আরও বেশি করে শুনতে চাই। শ্যামাসংগীত, আগমনী, ভক্তিগীতি, কীর্তন কিংবা দেবীকে নিবেদিত গান পূজার নিজস্ব আবহকে আরও পূর্ণ করে। অন্যান্য সাংস্কৃতিক পরিবেশনা থাকবে, যেমন নৃত‍্যনাট‍্য, গীতিনাট‍্য ইত‍্যাদি।এতে আনন্দ থাকবে; তার পাশাপাশি পূজার গানও তার স্বাভাবিক মর্যাদা নিয়ে থাকুক—এটাই আমার কামনা।

আজ যখন নিউইয়র্কে অসংখ্য দুর্গাপূজার আয়োজন দেখি, তখন ১৯৯৭ সালের সেই প্রথম দিনের কথা মনে পড়ে। একসময়ের সীমিত আয়োজন আজ কতটা বিস্তৃত হয়েছে! এই পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে মনে হয়, প্রবাসে সংস্কৃতিকে ধরে রাখার সবচেয়ে সুন্দর উপায় হলো তাকে নতুন প্রজন্মের কাছে ভালোবাসার সঙ্গে পৌঁছে দেওয়া। আর আমার প্রবাসজীবনের সেই যাত্রার প্রথম সুরটি আজও মনে বাজে—“মনেরই বাসনা, শ্যামা স্ববাসনা…”। নিউইয়র্কের মাটিতে আরও বেশি পূজা হোক, পূজামণ্ডপে ভক্তির সুর বেজে উঠুক, আর এই উৎসব প্রজন্মকে শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত করে রাখুক।

কাবেরী দাশ
প্রেসিডেন্ট
সংগীত পরিষদ নিউইয়র্ক