Logo

অপরাধ    >>   রংপুরের ৪ খুন: আরেকটি ‘জজ মিয়া নাটক’ নয় তো?

রংপুরের ৪ খুন: আরেকটি ‘জজ মিয়া নাটক’ নয় তো?

রংপুরের ৪ খুন: আরেকটি ‘জজ মিয়া নাটক’ নয় তো?

নয়ন বিশ্বাস রকি:

রংপুর আবারও রক্তাক্ত। একই পরিবারের চারজন মানুষের হত্যাকাণ্ডে পুরো দেশ যখন শোক ও উদ্বেগে, তখন এই ঘটনার তদন্ত ও পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠছে। নিহতদের মধ্যে গণপতি চক্রবর্তীর নাম থাকায় ঘটনাটি বিশেষভাবে স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—এটি কি নিছক একটি অপরাধ, নাকি এর পেছনে আরও কোনো গভীর কারণ রয়েছে?

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কোনো একটি নির্দিষ্ট বয়ানকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে কি না। অতীতের অভিজ্ঞতা আমাদের সতর্ক করে দেয়। তাই রংপুরের চার হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন দ্রুত কোনো সিদ্ধান্তে না গিয়ে সব সম্ভাবনা সামনে রেখে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত।

ঘটনার পর পুলিশের পক্ষ থেকে যে প্রাথমিক তথ্য ও সম্ভাব্য মোটিভের কথা বলা হচ্ছে, তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, নিহতদের পারিবারিক ও সামাজিক পরিচয় এবং ঘটনার আগে-পরে তাদের গতিবিধি—সবকিছু সমন্বয় করে তদন্ত করা জরুরি।

কোনো হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নির্ধারণের আগে সব ধরনের সম্ভাবনা যাচাই করা তদন্তের মৌলিক দায়িত্ব। এটি পারিবারিক বিরোধ, আর্থিক সংকট, ব্যক্তিগত শত্রুতা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কিংবা সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্য—যে কোনো কারণ হতে পারে। আবার একাধিক কারণও একসঙ্গে কাজ করতে পারে।

তাই প্রশ্ন হলো, সব সম্ভাবনা কি সমান গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে?

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার তদন্তে ‘জজ মিয়া’কে সামনে এনে যে বয়ান তৈরি করা হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে সেটি বাংলাদেশের বিচার ও তদন্তব্যবস্থার ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে আলোচিত হয়েছে। প্রকৃত ঘটনা আড়াল করতে ভুল ব্যক্তিকে দায়ী করার চেষ্টা কী ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে, সেই অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে।

সেই কারণেই রংপুরের চার হত্যাকাণ্ডের তদন্তে কোনো নিরপরাধ মানুষকে দায়ী করে দ্রুত মামলার ‘সমাধান’ দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে কি না—এ প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়।

তবে অতীতের কোনো ঘটনার সঙ্গে বর্তমান ঘটনাকে সরাসরি এক করে দেখাও ঠিক হবে না। বরং অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার এমন তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তদন্তের কোনো পর্যায়েই সাজানো গল্প, জোর করে স্বীকারোক্তি কিংবা নিরপরাধ কাউকে ফাঁসানোর অভিযোগ ওঠার সুযোগ না থাকে।

একটি হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে সময়, দক্ষতা ও স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন। কিন্তু ঘটনার অল্প সময়ের মধ্যেই যদি হত্যার উদ্দেশ্য, অপরাধীর পরিচয় এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র সম্পর্কে নিশ্চিত বক্তব্য দেওয়া হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—তদন্ত কি সত্য অনুসন্ধানের পথে এগোচ্ছে, নাকি আগে থেকেই একটি নির্দিষ্ট বয়ান তৈরি করে সেটিকে প্রমাণ করার চেষ্টা চলছে?

এই প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমেই দিতে হবে।

তদন্তকারী সংস্থার প্রতিটি পদক্ষেপ হতে হবে প্রমাণনির্ভর। কে কোথায় ছিলেন, মোবাইল ফোনের তথ্য কী বলছে, সিসিটিভিতে কী পাওয়া যাচ্ছে, আলামত কী বলছে, ফরেনসিক পরীক্ষার ফল কী, প্রত্যক্ষদর্শীরা কী বলেছেন—প্রতিটি বিষয় স্বাধীনভাবে যাচাই করতে হবে।

কোনো ব্যক্তিকে শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে অপরাধী বানানো যাবে না। একইভাবে প্রকৃত অপরাধীকে রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা অন্য কোনো প্রভাবের কারণে আড়ালও করা যাবে না। গণপতি চক্রবর্তীসহ চারজনকে কেন হত্যা করা হলো—এই প্রশ্নের উত্তরই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। চারজন মানুষকে হত্যার পেছনে প্রকৃত কারণ কী—এটি শুধু নিহতদের পরিবারের প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রের কাছেও জবাবদিহির বিষয়।

বিশেষ করে গণপতি চক্রবর্তীর মতো একজন সাধারণ নাগরিক কেন হত্যার শিকার হলেন, তার কোনো বিশেষ পরিচয় বা পূর্বশত্রুতা ছিল কি না, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কোনো সাম্প্রদায়িক, রাজনৈতিক বা আর্থিক উদ্দেশ্য যুক্ত ছিল কি না—সবকিছু তদন্তের আওতায় আনতে হবে। কোনো সম্ভাবনাকে শুধু অনুমানের ভিত্তিতে সত্য বলা যাবে না। আবার কোনো সম্ভাবনাকে তদন্তের শুরুতেই বাতিলও করা যাবে না।

দেশে একের পর এক হত্যাকাণ্ড, ছিনতাই, গণপিটুনি, রাজনৈতিক সহিংসতা ও প্রতিশোধমূলক সহিংসতার ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। একটি হত্যাকাণ্ডের পর কয়েকজনকে গ্রেপ্তার দেখানোই তদন্তের শেষ কথা হতে পারে না। প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত, নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সংগ্রহ, আদালতে সুষ্ঠু বিচার এবং দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

বিচারহীনতার সংস্কৃতি কোনো সমাজের জন্যই নিরাপদ নয়। অপরাধী যদি মনে করে অপরাধ করেও পার পাওয়া সম্ভব, তাহলে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রের শক্তি কেবল আইন প্রয়োগে নয়; আইনের ন্যায়সংগত ও নিরপেক্ষ প্রয়োগেই রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হয়। বাংলাদেশের মানুষ অতীতে বহু আলোচিত হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার তদন্ত নিয়ে বিতর্ক দেখেছে। কোথাও তদন্তের বয়ান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, কোথাও প্রকৃত সত্য জানতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে।

রংপুরের চার হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে সেই পুরোনো ভুলের পুনরাবৃত্তি কোনোভাবেই কাম্য নয়। নিহতদের পরিবার সত্য জানতে চায়। রংপুরের মানুষ সত্য জানতে চায়। দেশের মানুষও জানতে চায়—চারজন মানুষকে কারা হত্যা করেছে, কেন হত্যা করেছে এবং এর পেছনে কোনো বড় স্বার্থ বা পরিকল্পনা ছিল কি না।

এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে জনআস্থা ফিরিয়ে আনতে তদন্ত হতে হবে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, প্রমাণনির্ভর ও স্বচ্ছ। সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের তথ্য, ফরেনসিক রিপোর্ট, ডিএনএ ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক আলামত এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করতে হবে।

কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে হয়রানি, নির্যাতন বা জোরপূর্বক স্বীকারোক্তির মাধ্যমে মামলার আসামি বানানো যাবে না। তদন্তে কোনো কর্মকর্তা বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনিয়মের বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ উঠলে তারও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। প্রয়োজনে স্বতন্ত্র ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত কমিশন গঠন করে তদন্তের অগ্রগতি জনসমক্ষে তুলে ধরা যেতে পারে। আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থার সহায়তা প্রয়োজন হলে সেটিও যথাযথ রাষ্ট্রীয় ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হতে হবে।

রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব তার নাগরিকের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। রংপুরের চার হত্যাকাণ্ড সেই দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত সত্য উদঘাটন না হওয়া পর্যন্ত কোনো পক্ষেরই অনুমানকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা উচিত নয়।

আমরা আর কোনো ‘জজ মিয়া’ চাই না। চাই না নিরপরাধ কাউকে সামনে এনে প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করা হোক। চাই না তদন্তের নামে একটি সাজানো গল্প তৈরি করে জনগণকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করা হোক। মানুষ চায় সত্য। পরিবার চায় বিচার। রাষ্ট্রের কাছে জনগণের প্রত্যাশা—নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকৃত অপরাধীর শনাক্তকরণ এবং আইনের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক বিচার।

রংপুরের চার হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত সত্য উদঘাটন হোক। কোনো অপরাধী যেন রাজনৈতিক, প্রশাসনিক কিংবা অন্য কোনো প্রভাবের কারণে রক্ষা না পায়। আর কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন মিথ্যা মামলার শিকার না হয়।

সত্য উদঘাটনই হোক তদন্তের একমাত্র লক্ষ্য—কোনো ‘জজ মিয়া নাটক’ নয়।

নয়ন বিশ্বাস রকি
সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, সমাজকর্মী ।