একটি নবজাতকের প্রথম কান্না: ফাদার্স ডে-র এক দার্শনিক ভাবনা
ডা: আজিজ:
মানবজীবনে বিজ্ঞানের ভূমিকা অত্যন্ত অনন্য। পৃথিবীকে বোঝা এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করার জন্য মানবজাতি যে শক্তিশালী উপায়গুলো সৃষ্টি করেছে, বিজ্ঞান তার মধ্যে অন্যতম। ইতিহাসজুড়ে বিজ্ঞান অসংখ্য উপকার বয়ে এনেছে, যা মানুষের জীবনযাপন, কাজের ধরন, যোগাযোগ এবং চিন্তাভাবনাকে আমূল বদলে দিয়েছে। বহু মহান বিজ্ঞানীর অবদান আমাদের জীবনকে আরও সহজ, নিরাপদ এবং স্বাচ্ছন্দ্যময় করেছে।
বিজ্ঞানের অন্যতম বড় শক্তি হলো এর প্রমাণভিত্তিক চিন্তাধারা। যথাযথ ব্যাখ্যা বা প্রমাণ ছাড়া বিজ্ঞান কোনো ধারণা বা মতবাদ গ্রহণ করে না। এই পদ্ধতি ভুল বিশ্বাস দূর করতে সাহায্য করে এবং জ্ঞানকে নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। এ কারণেই বিজ্ঞান প্রতিনিয়ত নিজেকে সংশোধন করে, বিকশিত হয় এবং আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
যদিও আধুনিক সমাজ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ও প্রমাণভিত্তিক যুক্তির ওপর নির্ভরশীল, তবুও মানুষ—এমনকি উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিরাও—অনেক বিষয় ও চর্চায় বিশ্বাস করে যা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়। নানা আচার-অনুষ্ঠান, খাদ্যাভ্যাস, প্রথাগত চিকিৎসা, সম্পর্কের রীতি, রাজনৈতিক মতামত এবং ধর্মীয় বিশ্বাস অনেক সময় বৈজ্ঞানিক প্রমাণের পরিবর্তে দার্শনিক চিন্তা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য কিংবা ব্যক্তিগত বিশ্বাস থেকে গড়ে ওঠে।
এটি মানবস্বভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যকে প্রকাশ করে: বিজ্ঞান আমাদের ভৌত জগতকে বুঝতে সাহায্য করলেও, মানুষ জীবনের অর্থ, পরিচয়, মানসিক শান্তি ও আবেগীয় সংযোগ খুঁজে পায় এমন কিছু বিশ্বাসের মাধ্যমে, যা সবসময় মাপা বা পরীক্ষিত করা যায় না। এই অবৈজ্ঞানিক বিশ্বাসগুলো সমাজকে প্রভাবিত করে, আচরণ গঠন করে, একাত্মবোধ সৃষ্টি করে এবং মানসিক স্বস্তি দেয়। এতে বোঝা যায় যে মানুষের জীবন কেবল যুক্তি ও জ্ঞানের দ্বারা নয়, বরং সংস্কৃতি ও আবেগের দ্বারাও পরিচালিত হয়।
উপরের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আমি আমার একটি দার্শনিক ভাবনা শেয়ার করতে চাই। এটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়, এবং আমি জানি আপনি হয়তো কৌতূহলী হয়ে আছেন আমি কী বলতে যাচ্ছি। তার আগে বলতে চাই, আজ ফাদার্স ডে।
আজ পৃথিবীর সব বাবারাই খুশি, কারণ তারা তাদের সন্তানদের সঙ্গে ভালোবাসা, অনুভূতি ও জীবনের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিচ্ছেন। সন্তানরাও সময় কাটাচ্ছে তাদের প্রিয় বাবাদের সঙ্গে। তবে এটাও সত্য যে সমাজে ফাদার্স ডে, মাদার্স ডে-র মতো এতটা জাঁকজমকপূর্ণ, রঙিন বা আবেগঘনভাবে উদযাপিত হয় না। কারণ সন্তানের প্রতি মায়ের আত্মত্যাগ ও ভালোবাসা সত্যিই তুলনাহীন।
তবুও আমার এই দার্শনিক ভাবনাটি শুধুই মজার জন্য—ফাদার্স ডে-তে বাবাদের একটু বাড়তি সম্মান ও সন্তানদের কাছ থেকে একটু বাড়তি ভালোবাসা দেওয়ার একটি ছোট্ট প্রচেষ্টা। আমি আশা করি পৃথিবীর সব বাবাই এই চিন্তাটি উপভোগ করবেন—যদিও এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
ঘটনাটি প্রায় দশ বছর আগের। আমি নিউইয়র্কে একটি শিক্ষকতার চাকরির জন্য ইন্টারভিউ দিচ্ছিলাম। প্রাথমিক সাক্ষাৎকারের পর আমাকে অ্যানাটমি ও ফিজিওলজির ওপর ২০ মিনিটের একটি ডেমো লেকচার দিতে বলা হয়। কাকতালীয়ভাবে, সেটি ছিল ফাদার্স ডে-র পরের দিন। এই উপস্থাপনাটি আমার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ উপস্থাপনা ভালো হলে চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয় ।
ক্লাসরুমে ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, ডিন এবং অন্যান্য একাডেমিক ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। নারী প্রজনন তন্ত্রের ওপর আমার ২০ মিনিটের লেকচার শেষ হওয়ার পর আমি শ্রোতাদের প্রশ্ন করার সুযোগ দিলাম।
একজন ছাত্রী আমাকে প্রশ্ন করল, “একটি শিশু জন্মের পরপরই কেন কাঁদে?”
প্রথমে আমি কিছুটা অবাক হলাম, কারণ আমি নিশ্চিত ছিলাম যে সে বৈজ্ঞানিক উত্তরটি জানে। হঠাৎ আমার মনে পড়ল, সেদিনই তো ফাদার্স ডে শেষ হয়েছে। তখন ভাবলাম, একটু হাস্যরস যোগ করলে মন্দ হয় না। কারণ পড়াশোনার সঙ্গে যুক্ত হাস্যরস সবসময় শিক্ষার্থীদের মনোযোগ বাড়ায়।
তাই আমি প্রথমেই স্পষ্ট করে বললাম যে আমার উত্তরটি বৈজ্ঞানিক নয়। তবে যদি তারা আমাকে একটি দার্শনিক ভাবনা শেয়ার করার অনুমতি দেয়, তাহলে আমি বলব। সবাই সম্মতি দিল। তখন আমি বললাম:
“শিশুটি কাঁদে কারণ সে তার বাবাকে খুঁজছে।”
নয় মাস ধরে শিশুটি মায়ের গর্ভে থাকে। যদিও সেটিই পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ স্থান, তবুও এতদিন সেখানে থাকতে থাকতে শিশুটি বিরক্ত হয়ে যায়। সে তার বাবাকে দেখতে চায়। তাই সে মায়ের পেটে লাথি দিতে শুরু করে, যেন দ্রুত পৃথিবীতে এসে তার বাবার সঙ্গে দেখা করতে পারে।
কিন্তু জন্মের পরপরই সে তার বাবাকে দেখতে পায় না। বরং চারপাশে সাদা পোশাক পরা অনেক মানুষকে দেখতে পায়। শিশুটি তার বাবাকে খুঁজতে থাকে, কিন্তু তাকে পায় না। আর সেই কারণেই সে কাঁদতে শুরু করে।
আমার এই ব্যাখ্যার পর পুরো শ্রোতামণ্ডলী—এমনকি শিক্ষকরা পর্যন্ত—হাসিতে ফেটে পড়লেন এবং উত্তরটি উপভোগ করলেন। পরে একজন আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, কেন আমি এমন দার্শনিক উত্তর দিলাম। আমি শুধু মনে করিয়ে দিলাম যে আমরা মাত্রই ফাদার্স ডে উদযাপন করেছি, আর আমি চেয়েছিলাম কক্ষে উপস্থিত সব পুরুষকে ফাদার্স ডে-র শুভেচ্ছা জানাতে।
তারপর আমি সবাইকে একসঙ্গে “হ্যাপি ফাদার্স ডে” বলতে বললাম, এবং আমরা সব বাবার ভালোবাসা, ত্যাগ, দায়িত্ববোধ ও আজীবনের প্রচেষ্টাকে সম্মান জানালাম।
আজ আবার ফাদার্স ডে। এই মজার ইন্টারভিউ অভিজ্ঞতা এবং আমার দার্শনিক ভাবনাটি শেয়ার করার মাধ্যমে চলুন আমরা সব বাবাকে একটু হাসি উপহার দিই—এই ভাবনাটি দিয়ে যে, জন্মের পর শিশুর প্রথম কান্নাটি হয়তো তার বাবাকে খুঁজেই।
পৃথিবীর সকল বাবাকে জানাই ফাদার্স ডে-র আন্তরিক শুভেচ্ছা—আপনাদের আজীবনের ভালোবাসা, নিঃস্বার্থ ত্যাগ এবং সন্তানদের জন্য অবিরাম প্রচেষ্টার জন্য।
কলামিস্ট ডা:আজিজ , লং আইল্যান্ড ,নিউইয়র্ক ।



















