ট্রাফিক আইনের মতো রাজনীতিতেও আইন চাই: জনস্বার্থ রক্ষায় নেতৃত্বের জবাবদিহি
ডা: আজিজ:
আমার ছেলে আজমীর সম্প্রতি ১৬ বছরে পা দিয়েছে এবং ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য লার্নার পারমিট পেয়েছে। কয়েক দিন আগে সে গাড়ি চালানোর অনুশীলন শুরু করেছে, আর আমি তার প্রশিক্ষক হয়েছি। শুরুতেই আমি তাকে বিভিন্ন ট্রাফিক আইন শেখাই এবং নিয়ম না মানলে কী ধরনের পরিণতি হতে পারে সে সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিই।
অনেক নিয়ম-কানুন দেখে সে হতাশ হয়ে পড়ে এবং আমাকে জিজ্ঞেস করে—এগুলো কেন এত গুরুত্বপূর্ণ। আমি তাকে বুঝিয়ে বলি, আইন ও তার সঠিক প্রয়োগ কীভাবে সড়ক দুর্ঘটনা কমায় এবং মানুষের জীবন রক্ষা করে। ট্রাফিক আইন ও বিধি-বিধান কঠোরভাবে মেনে চললে আমরা নিজেদের এবং অন্যদের নিরাপদ রাখি। আমরা জানি, এই পৃথিবীতে মানবস্বার্থ ও নিরাপত্তার জন্যই আইন প্রণয়ন করা হয়।
কলামিস্ট ও ডা. আজিজ, লং আইল্যান্ড ।
মানবস্বার্থ ও নিরাপত্তা সম্পর্কে এই উপলব্ধির ভিত্তিতেই আজ আমি আপনাদের সামনে একটি নতুন উদ্বেগের কথা তুলে ধরছি।
রাজনৈতিক নেতা ও দলগুলো মানবজীবনে গভীর ও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে—এ কথা নিঃসন্দেহে সত্য। সারা বিশ্বে আমরা এর বহু উদাহরণ দেখেছি। নিষ্ঠা, সাহস, অঙ্গীকার ও সততার মাধ্যমে অনেক নেতা আমাদের জীবনকে আরও সুন্দর, নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করে তুলেছেন।
তবে এই ভালো উদাহরণগুলোর পাশাপাশি, বিশ্বজুড়ে অনেক রাজনৈতিক নেতা ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রতিষ্ঠান ভেঙে দেওয়া, বিভাজন উসকে দেওয়া এবং ভুল সিদ্ধান্তের মাধ্যমে জনস্বার্থ ও জননিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংস করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, রাজনৈতিক নেতারা সহিংস বক্তব্য ব্যবহার করেন বা চরমপন্থী আচরণকে প্রশ্রয় দেন। এর ফলে বাস্তব জীবনে সহিংসতা বৃদ্ধি পায় এবং নাগরিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতি হুমকি তৈরি হয়।
এর পরিণতিতে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়, রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়ে, দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ে এবং জনসম্পদ অপব্যবহৃত হয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মচারীদের ভয় দেখানোর ঘটনাও বিশ্বব্যাপী বাড়ছে, অথচ বৈশ্বিক সংকটগুলোর যথাযথ সমাধান হচ্ছে না।
এই সব কর্মকাণ্ডের ফলে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, জনআস্থার ক্ষয় এবং জবাবদিহির অভাব সৃষ্টি হয়েছে; মানুষ বিজ্ঞান ও বিশেষজ্ঞদের ওপর আস্থা হারাচ্ছে; সমাজে শত্রুতা ও বিভাজন বাড়ছে; অবকাঠামো ভেঙে পড়ছে, সামাজিক সেবা দুর্বল হচ্ছে, বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং রাজনীতিতে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। ভালো নেতারা রাজনীতি থেকে বিমুখ হচ্ছেন, নাগরিকেরা প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব হারাচ্ছেন; অস্থিরতা বাড়ছে এবং স্বার্থান্বেষী মানুষ রাজনীতিতে প্রবেশ করছে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ব্যর্থতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং অভিবাসন সংকটে লক্ষ লক্ষ মানুষ ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
এই বাস্তবতাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে রাজনৈতিক নেতারা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ রাজনৈতিক নেতৃত্বই নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, মানবাধিকার ও সামাজিক সম্প্রীতির ভিত্তি গঠন করে।
সুতরাং আজ আমি রাজনৈতিক নেতাদের জন্য নতুন আইন ও বিধিমালা প্রণয়নের আহ্বান জানাই—যেসব আইন রাজনৈতিক জবাবদিহি শক্তিশালী করবে, দুর্নীতি কমাবে এবং আরও নিরাপদ ও সম্প্রীতিপূর্ণ সমাজ গড়ে তুলবে। এসব নিয়ম নেতাদের কর্মকাণ্ডের ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য করবে, স্বচ্ছতা বাড়াবে এবং অসদাচরণের জন্য বাস্তব ও কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত করবে।
বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইতিমধ্যেই পেশাগত ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড তদারকি করে। কোনো অনিয়ম ধরা পড়লে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তাহলে আমার প্রশ্নটি খুবই সহজ—রাজনীতিবিদরা কেন এর বাইরে থাকবেন? কেন রাজনৈতিক আচরণ তদারকির জন্য স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা থাকবে না, যারা অসদাচরণ বন্ধ করবে, জননিরাপত্তা রক্ষা করবে এবং প্রয়োজনে তাদের রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ করবে?
সবশেষে আমি শুধু এটুকু স্মরণ করিয়ে দিতে চাই—
যখন নেতারা দায়িত্বশীলভাবে কাজ করেন, সমাজ সমৃদ্ধ হয়।
আর যখন তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করেন, সমাজ ভেঙে পড়ে।
ধন্যবাদ।


















