Logo

আন্তর্জাতিক    >>   ১৯৭১-এর ঊর্ধ্বে: ইতিহাস, রাজনীতি ও বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ

১৯৭১-এর ঊর্ধ্বে: ইতিহাস, রাজনীতি ও বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ

১৯৭১-এর ঊর্ধ্বে: ইতিহাস, রাজনীতি ও বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ

ডা. আজিজ:
প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক কেবল কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও নিরাপত্তার মৌলিক ভিত্তি। সীমান্ত ভাগাভাগি করা দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা সরাসরি শান্তি, বাণিজ্য, জ্বালানি, পানি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করে। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সামরিক উত্তেজনা ও সীমান্ত বিরোধের ঝুঁকি কমায়, আর স্থিতিশীল সীমান্ত উন্নয়নে মনোযোগী হতে সহায়তা করে। প্রতিবেশী দেশগুলো সাধারণত সবচেয়ে কম ব্যয়ে বাণিজ্যিক অংশীদার হয়; পাশাপাশি চিকিৎসা, শিক্ষা ও পর্যটনে মানুষে-মানুষে সংযোগ বিশ্বাস গড়ে তোলে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দুই দেশের দীর্ঘতম স্থলসীমান্ত, গভীর সাংস্কৃতিক সাযুজ্য ও অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা—সব মিলিয়ে সম্পর্কটি বহুমাত্রিক। ১৯৭১ সালে ভারতের নির্ণায়ক সমর্থন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অস্বীকার্য অধ্যায়, যা আবেগ ও কৃতজ্ঞতার ভিত্তি তৈরি করেছে। কিন্তু ইতিহাসের ওপর দাঁড়িয়ে গড়া সম্পর্কও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা ও জাতীয় স্বার্থের চাপ অনুভব করে।
ইতিহাস কৃতজ্ঞতা সৃষ্টি করে; রাজনীতি কখনও উত্তেজনা তৈরি করে। বর্তমান সম্পর্ক কেবল স্মৃতির ওপর নয়, সমসাময়িক প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ওপরও দাঁড়িয়ে আছে। প্রজন্মগত স্মৃতির পরিবর্তন, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পারস্পরিক ইস্যুকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার, সীমান্ত হত্যা, পানি বণ্টন, বাণিজ্য ঘাটতি, ট্রানজিট ও সংযোগ নিয়ে অমীমাংসিত প্রশ্ন—এসব বিষয় জনমনে হতাশা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে উভয় দেশে জাতীয়তাবাদের উত্থান, ধর্মীয় ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব, এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক টানাপোড়েন সম্পর্ককে জটিল করেছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কের আনুষ্ঠানিক সূচনা ১৯৭২ সালে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন চুক্তি ও সমঝোতার মাধ্যমে সম্পর্ক এগিয়েছে। ২০১৫ সালের স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন সীমান্ত সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী জট খুলে দেয়। বিদ্যুৎ বাণিজ্য, রেল ও সড়ক যোগাযোগ পুনরুদ্ধার, সমুদ্র ও নৌপথ ব্যবহার—এসব সহযোগিতা আঞ্চলিক সংযোগকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। তবু সীমান্তে প্রাণহানি ও নদীর পানি বণ্টন ইস্যুতে জনমতের সংবেদনশীলতা এখনো প্রবল।
আজকের বাস্তবতা হলো—দুই দেশ সাংস্কৃতিক, ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিকভাবে এতটাই সংযুক্ত যে দীর্ঘমেয়াদি বিচ্ছিন্নতা কারও স্বার্থে নয়। দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা অনেকাংশে নির্ভর করে বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের ভারসাম্যের ওপর। পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা, ন্যায্যতা ও স্বচ্ছ সংলাপই হতে পারে টেকসই সমাধানের পথ।
১৯৭১ রক্তের বন্ধন তৈরি করেছিল; ভবিষ্যৎ নির্মিত হবে আস্থা, ন্যায় ও সমতার ভিত্তিতে। আমাদের প্রজন্মের দায়িত্ব—ইতিহাসকে সম্মান জানিয়ে বর্তমানের সমস্যাগুলো বাস্তববাদী ও ন্যায্য উপায়ে সমাধান করা। প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, সহযোগিতাই হোক অগ্রাধিকার। কারণ শান্তি, মর্যাদা, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি—এগুলো এককভাবে নয়, যৌথভাবেই অর্জিত হয়।


কলামিস্ট  ডা. আজিজ,  লং আইল্যান্ড