সাত বছরেই ৪৯ কবিতার কাব্যগ্রন্থ, নিউইয়র্কে ক্ষুদে কবি পরমা টি পার্লকে ঘিরে সাহিত্যিকদের মিলনমেলা
উত্তম কুমার সাহা , প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক :
মাত্র সাত বছর বয়সে ৪৯টি কবিতা নিয়ে প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করে প্রবাসের সাহিত্যাঙ্গনে সাড়া জাগিয়েছে ক্ষুদে কবি পরমা টি পার্ল। শৈশবের কল্পনা, অনুভূতি, ভয়, স্বপ্ন ও ভালোবাসার বিচিত্র রং নিয়ে প্রকাশিত তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ Smell of My Words ঘিরে নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে বসেছিল কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিক্ষক, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সংস্কৃতিকর্মী ও বিশিষ্টজনদের বর্ণাঢ্য মিলনমেলা। মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্বালন, অতিথিদের প্রাণবন্ত আলোচনা, দেশাত্মবোধক গান, শিশুর স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির মানুষের আন্তরিক শুভেচ্ছায় অনুষ্ঠানটি পরিণত হয়েছিল এক অনন্য আনন্দঘন আয়োজনে। একটি শিশুর প্রথম বই প্রকাশের মধ্য দিয়ে প্রবাসে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও নতুন প্রজন্মের সৃজনশীলতা বিকাশের প্রত্যাশাও পেয়েছে নতুন মাত্রা।
জ্যাকসন হাইটসের জিউস সেন্টারে আয়োজিত পরমা টি পার্লের প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশনা অনুষ্ঠানটি ছিল একই সঙ্গে একটি শিশুর সৃজনশীল অর্জনের উদ্যাপন এবং প্রবাসী বাঙালি সমাজের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক বন্ধনের এক উজ্জ্বল প্রতিফলন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশিষ্টজনেরা ছোট্ট পরমার এই উদ্যোগকে স্বাগত জানান এবং তার সাহিত্যচর্চার ধারাবাহিক বিকাশ কামনা করেন।
অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেন বিশিষ্ট ছড়াকার মনজুর কাদের। তিনিই পরমার কাব্যগ্রন্থের নামকরণ করেছেন। বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও চিত্রশিল্পী তাজুল ইমাম। ঢাকার উচ্ছ্বাস প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত বইটির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ ডলার। অনুষ্ঠানের সূচনায় আমন্ত্রিত সম্মানিত অতিথিরা মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্বালনের মাধ্যমে প্রকাশনা অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন।
২০১৯ সালের ২ জানুয়ারি জন্ম নেওয়া পরমা বর্তমানে নিউইয়র্কের কুইন্সের জ্যামাইকার অ্যাবিগেইল অ্যাডামস স্কুলের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী। অল্প বয়সেই নিজের ভাবনা ও অনুভূতিকে কবিতার ভাষায় প্রকাশ করার মাধ্যমে সে দেখিয়েছে, সৃজনশীলতার বিকাশের জন্য বয়স কোনো চূড়ান্ত সীমা নয়। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থে স্থান পেয়েছে মোট ৪৯টি কবিতা। এসব কবিতায় ফুটে উঠেছে শিশুমনের কৌতূহল, আবেগ, ভালোবাসা, ভয়, আশা, স্বপ্ন এবং চারপাশের পৃথিবীকে নিজের মতো করে দেখার প্রবণতা।
বইটির উল্লেখযোগ্য কবিতাগুলোর একটি My Fear Is Here। সহজ ভাষায় লেখা এ কবিতায় ভয়কে মোকাবিলা করা, প্রস্তুত থাকা এবং স্বপ্ন পূরণের আনন্দকে তুলে ধরেছে ক্ষুদে কবি। জীবনের পথে ভয় ও অনিশ্চয়তা আসতে পারে, কিন্তু সেগুলো যেন স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়—কবিতাটির অন্তর্নিহিত বার্তায় এমনই ইতিবাচক মনোভাব প্রতিফলিত হয়েছে। শিশুসুলভ সরলতা ও আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়ে পরমা পাঠককে সাহসী হওয়ার অনুপ্রেরণা দিয়েছে।
Smell of My Words বইটির প্রচ্ছদেও রয়েছে শৈশবের কল্পনার রঙিন ছোঁয়া। দুই পাশে ঝুঁটি বাঁধা একটি ছোট্ট মেয়েকে ডেস্কে বসে বই পড়তে দেখা যায়। তার সামনে রাখা বইটিতে লেখা রয়েছে ‘Love’। চারপাশে প্যাস্টেল রঙের মেঘ ও বর্ণিল প্রজাপতির চিত্র প্রচ্ছদটিকে করেছে আকর্ষণীয়। ভালোবাসা, কৌতূহল ও কল্পনার এই চিত্রকল্প যেন পরমার কবিতার জগতেরই প্রতীক।
প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সাপ্তাহিক ঠিকানার সাবেক প্রধান সম্পাদক ফজলুর রহমান, অধ্যাপিকা হুসনে আরা, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও চিত্রশিল্পী তাজুল ইমাম, রাজনীতিবিদ ড. প্রদীপ কর, সিনিয়র সাংবাদিক শামীম আল আমিন, রাজনীতিবিদ ও ফোবানার সেন্ট্রাল কমিটির চেয়ারম্যান যাকারিয়া চৌধুরী, আবৃত্তিশিল্পী তাহমিনা পারভিন প্রীতি, সংস্কৃতিকর্মী ও উপস্থাপক স্বাধীন মজুমদার, কবি ফকির ইলিয়াস, কবি আবু সাঈদ রতন, সাপ্তাহিক সন্ধান পত্রিকার সম্পাদক সনজীবন সরকার, কবি হাসান আল আবদুল্লাহ, খ্যাতিমান শিশুসাহিত্যিক, কবি ও গীতিকার হুমায়ূন কবীর ঢালী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও বাচিকশিল্পী মিনহাজ আহমদ শাম্মু এবং সংগঠক ও আবৃত্তিশিল্পী মিথুন আহমেদ।
এ ছাড়া বক্তব্য ও শুভেচ্ছা জানান সংস্কৃতিকর্মী স্বপন দত্ত, রওশন আরা নিপা, স্কুলশিক্ষিকা মনিরা আখঞ্জি, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও কমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্ট স্বীকৃতি বড়ুয়া, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও কলামিস্ট গোপাল স্যানাল , পরিমল সাহা, বিদ্যুৎ সরকার, হরিপদ মণ্ডল, পরমার মেজজেঠু পার্থ প্রতীম, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সংগঠক তালুকদার, পরমার মেজমা তাপতি রায়, রাহুল রায়, প্রণব তালুকদার, সাহানা শাহরিয়ার, শাহরিয়ার মতিন, শিশু বক্তা পূর্ণাত্তম সাহা পূর্ণা, পরমার স্কুলশিক্ষিকা মিস শারমিন, পরমার মামা তন্ময় তালুকদার, মামী রুম্পা বসাক, ফুলমা প্রতিভা দাস, মা সেঁজুতি তালুকদার ও বাবা পিনাকী তালুকদার।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রজ্ঞা নিউজের সম্পাদক উত্তম কুমার সাহা, নির্বাহী সম্পাদক ও আবৃত্তিশিল্পী মুনমুন সাহা, সম্পাদক দীপক আচার্য, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নিউটন দাসসহ প্রবাসের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সাহিত্য সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
বক্তারা পরমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশকে তার জীবনের একটি স্মরণীয় অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁদের মতে, শিশুরা যখন নিজেদের অনুভূতি ও কল্পনাকে ভাষায় প্রকাশের সুযোগ পায়, তখন তাদের চিন্তাশক্তি, আত্মবিশ্বাস ও সৃজনশীলতা বিকশিত হয়। পরিবার, শিক্ষক এবং সমাজের সম্মিলিত উৎসাহ একটি শিশুর সুপ্ত প্রতিভাকে বিকশিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরমার এই উদ্যোগ অন্য শিশু-কিশোরদেরও বই পড়া, কবিতা লেখা এবং সাহিত্যচর্চায় আগ্রহী করে তুলতে পারে।
বক্তারা আরও বলেন, প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরমার মতো শিশুরা যখন সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়, তখন তা শুধু ব্যক্তিগত অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং পরিবার ও বৃহত্তর কমিউনিটির জন্যও আনন্দ ও গর্বের উপলক্ষ হয়ে ওঠে।
অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পর্বে তাহিয়াত অধরা বাংলাদেশের জনপ্রিয় দেশাত্মবোধক গান সব কটি জানালা খুলে দাও না পরিবেশন করেন। তার পরিবেশনা অনুষ্ঠানে দেশীয় সংস্কৃতি ও সংগীতের আবহ তৈরি করে। কবিতা, সাহিত্য, সংগীত এবং অতিথিদের আন্তরিক শুভেচ্ছায় পুরো আয়োজন হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত।
অনুষ্ঠানের আরেকটি আকর্ষণ ছিল পরমার স্বতঃস্ফূর্ত শিশুসুলভ উপস্থিতি। কখনো অতিথিদের সঙ্গে মিশেছে, কখনো খেলায় মেতেছে, আবার কখনো হেসে-খেলে কাটিয়েছে আনন্দের মুহূর্ত। আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও শুভেচ্ছার মধ্যেও তার এই স্বাভাবিক চঞ্চলতা উপস্থিত সবাইকে মনে করিয়ে দিয়েছে, সাহিত্যিক অর্জনের আনন্দের পাশাপাশি সে এখনো প্রাণবন্ত শৈশবেরই প্রতিনিধি।
পরমার সাহিত্যিক যাত্রার পেছনে রয়েছে তার পরিবারের আন্তরিক সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণা। তার মা সেঁজুতি তালুকদার একজন স্কুলশিক্ষক। বাবা পিনাকী তালুকদার গত ১২ বছর ধরে এইচঅ্যান্ডআর ব্লকে বেনিফিট স্পেশালিস্ট হিসেবে কাজ করছেন। পাশাপাশি তিনি নিউইয়র্কের টিবিএন টিভিতে সংবাদদাতা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। পরিবারের উৎসাহ ও সহযোগিতা পরমাকে নিজের ভাবনা প্রকাশের সুযোগ করে দিয়েছে। তার স্কুলশিক্ষিকা মিস শারমিনের উৎসাহও শিশুটির বিকাশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বইটির পেছনের প্রচ্ছদে রয়েছে স্বপ্নকে গুরুত্ব দেওয়া, সামনে এগিয়ে চলা এবং অসম্ভবকে সম্ভব করার প্রত্যয় জাগানো একটি অনুপ্রেরণামূলক বার্তা। এই বার্তা পরমার নিজের সাহিত্যিক যাত্রার সঙ্গেও যেন সামঞ্জস্যপূর্ণ। সাত বছর বয়সে ৪৯টি কবিতা নিয়ে একটি বই প্রকাশ নিঃসন্দেহে তার শৈশবের একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে পরমার বাবা সাংবাদিক পিনাকী তালুকদার ও মা সেঁজুতি তালুকদার উপস্থিত অতিথি, শুভানুধ্যায়ী, আয়োজনে সহযোগিতাকারী এবং পরিবারের সদস্যদের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। তাঁদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।
পরমা টি পার্লের প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের এই আয়োজন প্রমাণ করে, সৃজনশীলতার বিকাশের জন্য নির্দিষ্ট কোনো বয়সের অপেক্ষা করতে হয় না। প্রয়োজন কৌতূহল, কল্পনাশক্তি, উৎসাহ এবং নিজের ভাবনাকে প্রকাশের স্বাধীনতা। পরিবারের সমর্থন, শিক্ষকের অনুপ্রেরণা ও সমাজের ইতিবাচক স্বীকৃতি পেলে শিশুরা ছোটবেলা থেকেই নিজেদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পায়।
নিউইয়র্কের প্রবাসী বাঙালি কমিউনিটির সাহিত্য-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে পরমার Smell of My Words প্রকাশ তাই কেবল একটি শিশুর প্রথম বই প্রকাশের ঘটনা নয়, বরং নতুন প্রজন্মের সাহিত্যচর্চা ও সৃজনশীল বিকাশের সম্ভাবনারও এক আশাব্যঞ্জক দৃষ্টান্ত। আজকের এই ছোট্ট কবি আগামী দিনে কোন পথে এগিয়ে যাবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ নিঃসন্দেহে হয়ে থাকবে শৈশবের কল্পনা, স্বপ্ন ও আত্মপ্রকাশের এক স্মরণীয় দলিল।



















