স্বর্গে দেবী দুর্গার বিভ্রান্তি!: শাস্ত্রের তিথি, প্রবাসের উইকএন্ড আর হলভাড়ার হিসাব—ভক্তি কি আজ সুবিধাবাদের কাছে পরাজিত?
জয়দেব গাইন:
মহালয়ার পুণ্যপ্রভাতে যখন মর্ত্যে বেজে ওঠে আগমনী সুর, বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে শিউলি ফুলের সুবাস, আর মহিষাসুরমর্দিনীর স্তোত্রে মুখরিত হয় বাংলার আকাশ-বাতাস, তখন দেবী দুর্গার আগমনের প্রতীক্ষায় আনন্দে মেতে ওঠেন কোটি কোটি মানুষ। মহালয়া মানেই পিতৃপক্ষের অবসান ও দেবীপক্ষের সূচনার আবহ, মহিষাসুরমর্দিনীর আরাধনা এবং অশুভ শক্তির বিনাশে শুভ শক্তির জয়গান।
কিন্তু এবার কল্পনার স্বর্গলোকে যেন এক অদ্ভুত পরিস্থিতি! সিংহবাহিনী মা দুর্গা ত্রিশূল পাশে রেখে চিন্তিত মুখে বসে আছেন। সামনে কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী ও সরস্বতী। মর্ত্যে যাওয়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন, কিন্তু কখন যাত্রা শুরু হবে, কোথায় অবতরণ করবেন, আর কত দিন অবস্থান করবেন—তা নিয়েই দেবীর মনে গভীর সংশয়!
গণেশ মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, মা, সব প্রস্তুতি তো শেষ। মর্ত্যের ভক্তরা তোমার অপেক্ষায়। তাহলে এত চিন্তা কেন?
দেবী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, বাছা, ভক্তদের কাছে যাওয়ার জন্য আমার তো কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু মর্ত্যের মানুষই যখন আমার আগমন, অবস্থান আর বিদায়ের সময় ঠিক করতে গিয়ে পঞ্জিকার বদলে নিজেদের সুবিধার ক্যালেন্ডারকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, তখন আমি যাব কখন, আর ফিরবই বা কখন?
এটি নিছক কল্পনার সংলাপ, কিন্তু এর মধ্য দিয়ে উঠে আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—ধর্মীয় ঐতিহ্য ও শাস্ত্রীয় আচার-অনুষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষা করে আমরা উৎসব পালন করছি, নাকি আধুনিক জীবনযাত্রার সুবিধা অনুযায়ী উৎসবকে নতুন করে সাজিয়ে নিচ্ছি?
শাস্ত্রের তিথি বনাম সপ্তাহান্তের ক্যালেন্ডার
হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যে দুর্গাপূজার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তিথি, নক্ষত্র, পক্ষ, আচার ও উপাসনার দীর্ঘ ইতিহাস। আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষে দেবীপক্ষের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। মহালয়া পিতৃপক্ষের অবসান ও দেবীপক্ষের সূচনার সঙ্গে ঐতিহ্যগতভাবে সম্পর্কিত। ষষ্ঠীতে বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাস, সপ্তমীতে নবপত্রিকা-সহ পূজার আচার, অষ্টমীতে মহাষ্টমীর পূজা, সন্ধিপূজা, নবমীতে মহানবমীর উপাসনা এবং দশমীতে বিজয়া ও বিসর্জন—এসবই দুর্গোৎসবের বহুল প্রচলিত ধর্মীয় অনুষঙ্গ।
তবে তিথি ও পূজার সময় নির্ধারণে পঞ্জিকা, স্থানীয় সূর্যোদয়, তিথির ব্যাপ্তি এবং প্রচলিত শাস্ত্রীয় পদ্ধতির ভূমিকা রয়েছে। বিভিন্ন অঞ্চল ও সম্প্রদায়ের আচারেও কিছু পার্থক্য দেখা যায়। তাই দুর্গাপূজার তারিখ নির্ধারণ কেবল ইংরেজি ক্যালেন্ডারের কয়েকটি দিনের হিসাব নয়; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে ধর্মীয় বিধান ও দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য।
অথচ প্রবাসে কোথাও কোথাও দেখা যায়, শাস্ত্রীয় তিথির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার পরিবর্তে শনিবার ও রবিবারকে কেন্দ্র করেই দুর্গোৎসবের কর্মসূচি সাজানো হচ্ছে। কর্মব্যস্ত মানুষ যাতে অংশ নিতে পারেন, সেই বিবেচনায় সপ্তাহান্তে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মিলনমেলা, ভোগ বিতরণ ও প্রতিমা দর্শনের আয়োজন করা নিঃসন্দেহে বাস্তবসম্মত।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, সপ্তাহান্তে সামাজিক উৎসবের আয়োজন করা আর মূল ধর্মীয় পূজার তিথি নিজেদের সুবিধামতো নির্ধারণ করা কি একই বিষয়?
ধরা যাক, কোনো প্রবাসী সংগঠন মহালয়ার দিনেই ঢাকঢোল বাজিয়ে ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত সব আচার একসঙ্গে সম্পন্ন করে ফেলল, কিংবা দুই দিনের মধ্যেই পূজা ও বিসর্জনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করল। তখন দেবী যেন অবাক হয়ে প্রশ্ন করেন, আমি মর্ত্যে পৌঁছানোর আগেই যদি আমার বিদায়ের আয়োজন সম্পন্ন হয়ে যায়, তবে কি আমি শুধু সপ্তাহান্তের একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে এসেছি?
বাস্তবে প্রবাসের অনেক সংগঠন সীমিত সময়, কর্মব্যস্ততা ও ভেন্যুর সমস্যার কারণে সংক্ষিপ্ত আয়োজন করে থাকে। সব সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠানকে শাস্ত্রবিরোধী বলা যুক্তিসংগত নয়। কিন্তু সংক্ষিপ্ত আয়োজনের মধ্যেও মূল পূজার তিথি, বিধি ও ধর্মীয় তাৎপর্যকে যথাসম্ভব সম্মান জানানোই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচনা।
দেবীর আগমনের সময় কি হলের বুকিংয়ের ওপর নির্ভর করবে?
প্রবাসে দুর্গাপূজার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো উপযুক্ত মণ্ডপ বা হল পাওয়া। নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে পূজার আয়োজন করতে গেলে ভেন্যু ভাড়া, অগ্নিনিরাপত্তা, অনুমতি, বিমা, স্বেচ্ছাসেবক, অর্থসংস্থান এবং দর্শনার্থীদের যাতায়াতের মতো নানা বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে পছন্দের দিনে হল পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।
এই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। প্রবাসে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধরে রাখতে যাঁরা শ্রম দেন, অর্থ ব্যয় করেন এবং নিজেদের সময় উৎসর্গ করেন, তাঁদের অবদান অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার।
কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন হলের ভাড়া কম, নির্দিষ্ট দিনে ভেন্যু খালি, কিংবা সপ্তাহান্তে বেশি মানুষের উপস্থিতি নিশ্চিত করা যাবে—এমন হিসাবই পূজার সময়সূচি নির্ধারণের প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে।
কল্পনার স্বর্গলোকে তখন দেবী দুর্গার আরেকটি প্রশ্ন হতে পারে, মর্ত্যের মানুষ কি এবার পঞ্জিকা দেখবে, নাকি ভেন্যু ম্যানেজারের সঙ্গে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেই আমার আগমনের দিন স্থির করবে?
কেউ যদি ১৬ অক্টোবর থেকে পূজার আয়োজন শুরু করে ২০ অক্টোবর বিজয়া করতে চান, কেউ ১৭ বা ১৮ অক্টোবর অনুষ্ঠান শুরু করে ২১ অক্টোবর প্রতিমা বিসর্জনের পরিকল্পনা করেন, তাহলে প্রথমেই দেখতে হবে কোনটি মূল শাস্ত্রীয় পূজা, কোনটি সামাজিক উদ্যাপন, আর কোনটি স্থানীয় পরিস্থিতির কারণে নির্ধারিত কর্মসূচি। শুধু তারিখের পার্থক্য দেখেই কোনো আয়োজনকে ধর্মবিরোধী বলে ঘোষণা করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি সুবিধার অজুহাতে শাস্ত্রীয় সময়ের গুরুত্ব সম্পূর্ণ উপেক্ষা করাও কাম্য নয়।
পঞ্জিকা ও শাস্ত্রের আলোকে পূজার তিথি নির্ধারণের পর সেই অনুযায়ী ভেন্যু, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও অন্যান্য কর্মসূচির পরিকল্পনা করা গেলে ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং প্রবাসের বাস্তবতার মধ্যে একটি ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব।
দুর্গোৎসব কি শুধু সামাজিক অনুষ্ঠান, নাকি সাধনা ও আরাধনা?
দুর্গাপূজা শুধু আনন্দ, সাজসজ্জা, কেনাকাটা, ভোগ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা পারস্পরিক মিলনমেলার নাম নয়। এর কেন্দ্রে রয়েছে দেবী দুর্গার আরাধনা, শক্তির উপাসনা এবং অন্যায় ও অশুভের বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয়ের আদর্শ।
দেবীমাহাত্ম্য, যা শ্রীশ্রীচণ্ডী নামেও পরিচিত এবং মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্গত, সেখানে দেবীকে মহিষাসুরমর্দিনী রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। দেবতাদের সম্মিলিত শক্তির প্রতীক হিসেবে দেবীর আবির্ভাব এবং মহিষাসুরের বিরুদ্ধে তাঁর বিজয় অশুভের ওপর শুভের জয়ের প্রতীকী শিক্ষা বহন করে।
এই ধর্মীয় তাৎপর্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দুর্গোৎসবের মূল উদ্দেশ্য কেবল বাহ্যিক আয়োজন নয়; আত্মশুদ্ধি, ন্যায়, সাহস, সংযম ও মানবকল্যাণের আদর্শকে ধারণ করাও এর গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
তাহলে যে উৎসবের মূল ভিত্তি শক্তির আরাধনা ও শুভের প্রতিষ্ঠা, সেই উৎসবকে যদি আমরা কেবল দর্শকসংখ্যা, স্পনসর, হলের ভাড়া, টিকিট বিক্রি কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সাফল্য দিয়ে বিচার করি, তবে তার অন্তর্নিহিত ধর্মীয় তাৎপর্য কতটা অক্ষুণ্ণ থাকবে?
সামাজিক আয়োজন অবশ্যই প্রয়োজন। প্রবাসে দুর্গোৎসবের মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও পারিবারিক বন্ধনের সঙ্গে পরিচিত হয়। শিশু-কিশোরেরা পূজা, মন্ত্র, আরতি, ঢাক, ধুনুচি নাচ ও প্রতিমার মধ্য দিয়ে নিজেদের সাংস্কৃতিক শিকড়কে চিনতে শেখে। কিন্তু এই সামাজিক আনন্দ যেন মূল ধর্মীয় উদ্দেশ্যকে আড়াল না করে, সেদিকে আয়োজকদের সচেতন থাকা জরুরি।
থার্টি ফার্স্ট নাইটের সঙ্গে দুর্গোৎসব মেলানোর কল্পনা!
কল্পনার এই ব্যঙ্গচিত্রে আরও একটি প্রশ্ন উঠে আসে। যদি কোনো সংগঠন ৩১ ডিসেম্বরের থার্টি ফার্স্ট নাইটের অনুষ্ঠানকেও দুর্গোৎসবের সঙ্গে মিলিয়ে দিতে চায়, তাহলে দেবী দুর্গার কী হবে? একবার মর্ত্যে এসে আবার স্বর্গে ফিরে গিয়ে বছরের শেষে নতুন করে আগমনের প্রস্তুতি নিতে হবে নাকি?
অবশ্য ৩১ ডিসেম্বরের কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে দুর্গাপূজার স্মৃতি, বাংলা সংস্কৃতি বা হিন্দু ঐতিহ্য নিয়ে আলোচনা করা এক বিষয়; আর সেটিকে প্রকৃত শাস্ত্রীয় দুর্গাপূজা হিসেবে উপস্থাপন করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। এই পার্থক্যটি স্পষ্ট থাকা দরকার।
ধর্মীয় উৎসবের সঙ্গে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান যুক্ত হতে পারে, উৎসবের স্মৃতিচারণ হতে পারে, প্রবাসী মানুষের মিলনমেলাও হতে পারে। কিন্তু সবকিছুকে একই নামে অভিহিত করলে মূল আচার-অনুষ্ঠানের স্বাতন্ত্র্য ও তাৎপর্য নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
দেবী দুর্গার কল্পিত প্রশ্নটি তাই আমাদের নিজেদের দিকেই ফিরে আসে—আমরা কি ধর্মীয় ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিচ্ছি, নাকি সুবিধাজনক সময়ে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করাকেই ধর্মীয় কর্তব্যের সমতুল্য মনে করছি?
প্রবাসের বাস্তবতা ও শাস্ত্রীয় নিষ্ঠার মধ্যে সমন্বয় জরুরি
প্রবাসে বসবাসের বাস্তবতা বাংলাদেশের কিংবা ভারতের মতো নয়। অধিকাংশ মানুষকে কর্মস্থল, সন্তানদের স্কুল, যাতায়াত, হলের প্রাপ্যতা ও সীমিত বাজেটের সঙ্গে সমন্বয় করে চলতে হয়। ফলে প্রত্যেকের পক্ষে প্রতিদিনের পূজায় উপস্থিত থাকা কিংবা দীর্ঘ সময় ধরে ধর্মীয় আচার পালন করা সব সময় সম্ভব হয় না।
এই বাস্তবতার প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া দরকার। ধর্মীয় আয়োজনের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সংগঠকদের যে আর্থিক ও সাংগঠনিক চাপ সামলাতে হয়, তা-ও বিবেচনায় নিতে হবে।
তবে সমাধান হওয়া উচিত পরিকল্পনা, আলোচনা ও ধর্মীয় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের মাধ্যমে। স্থানীয় পঞ্জিকা অনুযায়ী মূল পূজার তিথি ও সময় নির্ধারণ করে আগে থেকেই হল বুকিং, পুরোহিতের সঙ্গে পরামর্শ, বাজেট তৈরি এবং স্বেচ্ছাসেবকদের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া যেতে পারে। মূল পূজার বাইরে সপ্তাহান্তে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রীতিভোজ, আলোচনা সভা কিংবা প্রতিমা দর্শনের আয়োজন করা সম্ভব।
যদি কোনো কারণে নির্দিষ্ট তিথিতে প্রচলিত পূজার সম্পূর্ণ আয়োজন করা কঠিন হয়, তবে অভিজ্ঞ পুরোহিত ও সংশ্লিষ্ট শাস্ত্রজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে যথাযথ সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। কারণ শাস্ত্রীয় আচার, স্থানীয় রীতি এবং বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে জ্ঞান, সংবেদনশীলতা ও দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন।
ছোট পরিসরে সঠিক তিথি ও বিধি অনুসরণ করে পূজা করা, ভক্তির পরিবেশ বজায় রাখা এবং ধর্মীয় তাৎপর্যকে গুরুত্ব দেওয়া অনেক সময় বাহ্যিক আড়ম্বরের চেয়েও বেশি অর্থবহ হতে পারে।
দেবীকে কি আমরা বরণ করছি, নাকি নিজেদের সুবিধাকে?
এই প্রশ্ন কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সংগঠনকে আঘাত করার জন্য নয়। বরং দুর্গোৎসবের প্রকৃত তাৎপর্য নিয়ে আত্মসমালোচনা করার একটি আহ্বান।
ধর্ম ও সংস্কৃতি স্থবির নয়; সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার প্রকাশভঙ্গিতে পরিবর্তন আসতে পারে। প্রবাসে দুর্গাপূজার আয়োজনের ধরনও পরিস্থিতি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু পরিবর্তনের নামে ঐতিহ্যের মূল ভিত্তি সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়া উচিত নয়।
পঞ্জিকা কেবল একটি তারিখের তালিকা নয়; ধর্মীয় আচার পালনের সময় নির্ধারণে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। তিথি ও পূজার বিধানকে যথাযথভাবে বোঝার জন্য প্রয়োজন জ্ঞান, পরামর্শ ও নিষ্ঠা। একই সঙ্গে অন্যের আয়োজন সম্পর্কে মন্তব্য করার আগে প্রকৃত তথ্য জানা এবং ধর্মীয় পার্থক্যগুলো বোঝাও জরুরি।
আমাদের মনে রাখতে হবে, দুর্গাপূজার মহিমা শুধু মণ্ডপের উচ্চতায়, প্রতিমার জাঁকজমকে কিংবা আলোকসজ্জার চাকচিক্যে নয়। এর প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে ভক্তি, শ্রদ্ধা, শৃঙ্খলা, মানবিকতা এবং অশুভের বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয়ের আদর্শে।
মা দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করেছিলেন অশুভ শক্তির বিনাশের প্রতীক হিসেবে। সেই দেবীর পূজা করতে গিয়ে যদি আমরা নিজেদের মধ্যে অহংকার, বিভেদ, স্বার্থপরতা ও সুবিধাবাদকে প্রশ্রয় দিই, তবে আমাদের উৎসবের অন্তর্নিহিত শিক্ষা কোথায়?
আসুন, এই দুর্গোৎসবে আমরা নিজেদের বিবেককে প্রশ্ন করি—আমরা কি দেবীকে ভক্তিভরে আবাহন করছি, নাকি নিজেদের ছুটির ক্যালেন্ডার, হলের বুকিং এবং আর্থিক সুবিধা অনুযায়ী তাঁকে পরিচালনা করতে চাইছি?
প্রবাসে কিংবা স্বদেশে, যেখানেই থাকি না কেন, আমাদের কর্তব্য হওয়া উচিত ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখা, শাস্ত্রীয় বিধান সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে দুর্গোৎসবের প্রকৃত তাৎপর্য তুলে ধরা।
মা দুর্গা যেন আমাদের বিভ্রান্তি দূর করেন, বিবেক জাগ্রত করেন এবং সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার পথে পরিচালিত করেন। তাঁর আগমন যেন কেবল ক্যালেন্ডারের একটি নির্ধারিত দিন কিংবা সপ্তাহান্তের আনন্দে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং আমাদের হৃদয়ে জাগিয়ে তুলুক শুভবুদ্ধি, ঐক্য, ভক্তি ও কল্যাণের চেতনা।
জয় মা দুর্গা।
জয়দেব গাইন
হিন্দু কমিউনিটির নেতা ।



















