ব্যক্তিগত প্রাপ্তির ঊর্ধ্বে মানবসেবা, নিউইয়র্ক স্টেটের প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর নীতিনির্ধারণে বাংলাদেশি-আমেরিকান আদন ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
উত্তম কুমার সাহা,প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক :
নিউইয়র্কের সফল নারী উদ্যোক্তা ও রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী আদন ইসলাম। পেশাগত জীবনে সাফল্যের পাশাপাশি তিনি কাজ করছেন প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, সমান সুযোগ নিশ্চিতকরণ এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবনমান উন্নয়নে। ব্যক্তিগত অর্জনের গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর সমাজের কল্যাণে অবদান রাখার প্রত্যয়ে তিনি যুক্ত হয়েছেন নিউইয়র্ক স্টেটের ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅ্যাবিলিটি কাউন্সিলের সঙ্গে। ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৭ সাল পর্যন্ত মেয়াদে কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। তাঁর এই দায়িত্ব শুধু ব্যক্তিগত সম্মানের বিষয় নয়, বরং বাংলাদেশি-আমেরিকান কমিউনিটির প্রতিনিধিত্ব এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও প্রয়োজন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
প্রজ্ঞা প্রতিনিধির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে আদন ইসলাম বলেন, আমি অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করি। তবে সব সময় চেষ্টা করি, সমাজের যাঁরা পিছিয়ে আছেন, যাঁরা নানা সীমাবদ্ধতার কারণে নিজেদের অধিকার ও প্রাপ্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন, তাঁদের জন্য অর্থবহ কিছু করতে। আমার কাছে জীবনের সাফল্য শুধু আর্থিক প্রতিষ্ঠা, ব্যক্তিগত অর্জন কিংবা সামাজিক পরিচিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলার প্রচেষ্টাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
আমেরিকায় আসার কিছুদিন পরই তাঁর এই পথচলার সূচনা হয়। অটিজম সোসাইটির রুবাইয়া রহমানের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় তিনি নিউইয়র্ক স্টেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী সংস্থায় কাজ করার জন্য আবেদন করেন। দীর্ঘ যাচাই-বাছাই ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া শেষে ২০২৪ সালের জুনে নিউইয়র্ক স্টেটের গভর্নর ক্যাথি হোকুলের এক্সিকিউটিভ চেম্বারের অধীন ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅ্যাবিলিটি কাউন্সিলে সদস্য হিসেবে নিয়োগ পান তিনি। আদন ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর জানা মতে, এই পদে এর আগে কোনো বাংলাদেশি-আমেরিকান দায়িত্ব পালন করেননি। তাঁর নিয়োগের মেয়াদ ২০২৭ সাল পর্যন্ত।
এই নিয়োগের মধ্য দিয়ে নিউইয়র্ক স্টেটের বিকাশগত প্রতিবন্ধিতা থাকা মানুষের অধিকার, জীবনমান উন্নয়ন এবং তাঁদের জন্য কার্যকর সেবা নিশ্চিত করার বিষয়ে আলোচনায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন আদন ইসলাম। তাঁর মতে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমস্যা ও চাহিদা শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; এগুলো শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা, ভাষাগত অন্তর্ভুক্তি এবং সমান সুযোগের মতো বৃহত্তর বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই তাঁদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তুলে ধরা অত্যন্ত জরুরি।
নিউইয়র্ক স্টেটের রাজধানী আলবেনীতে কাউন্সিলের সভায় অংশ নিতে তাঁকে প্রতিবছর একাধিকবার যেতে হয়। এসব সভায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর কল্যাণে গৃহীত উদ্যোগ, সংশ্লিষ্ট নীতিমালা এবং সেবাব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে আলোচনার সুযোগ পান। তাঁর কাছে এই দায়িত্বের গুরুত্ব আনুষ্ঠানিক পদমর্যাদায় নয়, বরং মানুষের বাস্তব সমস্যাগুলো তুলে ধরে সম্ভাব্য সমাধানের পথ তৈরিতে।
নিজের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সন্তানদের মধ্যেও মানবসেবার মূল্যবোধ গড়ে তুলতে চান আদন ইসলাম। এ কারণে তিনি প্রায়ই তাঁর বড় ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে আলবেনীতে যান। তিনি মনে করেন, সন্তানদের শুধু মুখে ভালো কথা শেখালেই হয় না, বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েও শিক্ষা দিতে হয়। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং সরকারি নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল করে তুলতে পারে।
গভর্নরের নিয়োগপত্রকে জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি হিসেবে উল্লেখ করে আদন ইসলাম বলেন, এই স্বীকৃতি তাঁকে আনন্দিত করার পাশাপাশি দায়িত্ববোধও বাড়িয়ে দিয়েছে। একজন সাধারণ মানুষও আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও কাজের মাধ্যমে বৃহত্তর সমাজে অবদান রাখতে পারেন—এই বিশ্বাস তাঁকে সামনে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে।
এবারের কাউন্সিলের সভায় আদন ইসলাম বাংলা ভাষাকে ল্যাঙ্গুয়েজ ইনোভেশন ফান্ডের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি তুলে ধরেছেন বলে জানান। তাঁর মতে, ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; সরকারি তথ্য জানা, প্রয়োজনীয় সেবা গ্রহণ এবং নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও ভাষার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত অনেক অভিবাসী পরিবার ইংরেজিতে পর্যাপ্ত দক্ষতা না থাকায় বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচি, সামাজিক সহায়তা এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য উপলব্ধ সেবা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে সমস্যায় পড়েন। বিশেষ করে যেসব পরিবারে অটিজম বা অন্যান্য বিকাশগত প্রতিবন্ধিতা রয়েছে, তাদের জন্য সহজবোধ্য ভাষায় নির্ভরযোগ্য তথ্য ও সহায়তা পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আদন ইসলাম মনে করেন, বাংলা ভাষায় তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়ানো গেলে বাংলাদেশি-আমেরিকান পরিবারগুলো উপকৃত হবে। তাঁরা সংশ্লিষ্ট সেবা সম্পর্কে আরও ভালোভাবে জানতে পারবেন, নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে পারবেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা গ্রহণের পথ খুঁজে পাবেন। এ লক্ষ্যে তিনি বাংলা ভাষাকে সংশ্লিষ্ট উদ্যোগে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব ও সুপারিশ তুলে ধরেছেন।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কমিউনিটিভিত্তিক সচেতনতা ও অ্যাডভোকেসি কার্যক্রমের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন আদন ইসলাম। তাঁর মতে, বাংলাদেশি-আমেরিকান সমাজের অনেক পরিবার অটিজম ও অন্যান্য বিকাশগত প্রতিবন্ধিতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য জানে না। কোথায় গেলে সহায়তা পাওয়া যায়, কী ধরনের সেবা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে কিংবা সন্তানের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় কোন প্রতিষ্ঠান সহযোগিতা করতে পারে—এসব বিষয় সম্পর্কে অনেকের স্পষ্ট ধারণা নেই।
ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা, সামাজিক সংকোচ এবং তথ্যের অভাবে কোনো পরিবার যেন প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে দূরে না থাকে, সে জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কমিউনিটির সামাজিক সংগঠন, শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, অভিভাবক এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। আদন ইসলামের মতে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি শুধু সংশ্লিষ্ট পরিবারের দায়িত্ব নয়; এটি পুরো সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। সঠিক তথ্য, উপযুক্ত দিকনির্দেশনা এবং প্রয়োজনীয় সেবার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের সুযোগ তৈরি করা গেলে বহু পরিবার উপকৃত হতে পারে।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সেবাব্যবস্থায় সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও ব্যক্তিগত চাহিদাকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়েও কাজ করছেন আদন ইসলাম। তিনি জানান, গত বছর কাউন্সিলের সভায় নিজের ছেলের প্রসঙ্গ তুলে অটিজম সেন্টারগুলোতে দক্ষিণ এশীয় খাবার সরবরাহের বিষয়টি উত্থাপন করেছিলেন। তাঁর মতে, খাবার মানুষের সংস্কৃতি, পারিবারিক অভ্যাস ও দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। দক্ষিণ এশীয় পরিবারের অনেক শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কের খাদ্যাভ্যাস তাঁদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত। তাই সেবাকেন্দ্রগুলোতে খাবারসহ দৈনন্দিন প্রয়োজনের ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য বিবেচনায় নেওয়া হলে সেবাগ্রহীতাদের জন্য পরিবেশ আরও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ হতে পারে।
তিনি মনে করেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম বা চিকিৎসাসংক্রান্ত বিষয় নয়, তাঁদের ব্যক্তিগত পছন্দ, সাংস্কৃতিক পরিচয়, পারিবারিক অভিজ্ঞতা ও স্বতন্ত্র চাহিদাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সেবাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রত্যেক ব্যক্তির মর্যাদা ও প্রয়োজনের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন।
রিয়েল এস্টেট ব্যবসার ব্যস্ততার মধ্যেও সামাজিক দায়িত্ব পালনের জন্য সময় বের করেন আদন ইসলাম। পেশাগত সাফল্যের পাশাপাশি মানুষের জন্য কাজ করাকে তিনি নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখেন। তাঁর বিশ্বাস, শিক্ষা, অভিজ্ঞতা ও সুযোগের সুফল শুধু নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজের কল্যাণে কাজে লাগানো উচিত। জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পাশাপাশি মানুষের জন্য কিছু করার মানসিকতা থাকা জরুরি বলে মনে করেন তিনি। যাঁরা নানা কারণে পিছিয়ে আছেন, যাঁরা সমান সুযোগ পাচ্ছেন না, তাঁদের পাশে দাঁড়ানো সবার দায়িত্ব।
গভর্নরের নিয়োগপত্রের ছবি বারবার প্রকাশ করার পেছনেও রয়েছে অন্যদের অনুপ্রাণিত করার আকাঙ্ক্ষা। আদন ইসলাম চান, বাংলাদেশি-আমেরিকান কমিউনিটির তরুণ প্রজন্ম বুঝতে শিখুক যে আন্তরিক প্রচেষ্টা ও যোগ্যতার মাধ্যমে বৃহত্তর সমাজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বেও অংশ নেওয়া সম্ভব। একই সঙ্গে তিনি চান, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার, মর্যাদা ও সমান সুযোগের বিষয়টি কমিউনিটির আলোচনায় আরও গুরুত্ব পাক।
নিজের এই পথচলায় রুবাইয়া রহমানের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণার কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে উল্লেখ করেন তিনি। তবে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য আরও অনেক কাজ বাকি রয়েছে বলেও মনে করেন। বাংলা ভাষায় তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ সম্প্রসারণ, বাংলাদেশি কমিউনিটিতে প্রতিবন্ধিতা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, সাংস্কৃতিকভাবে সংবেদনশীল সেবাব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং অধিকার প্রতিষ্ঠায় কার্যকর অ্যাডভোকেসি কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়াই তাঁর অন্যতম লক্ষ্য।
আদন ইসলাম জানেন, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করলেই তাৎক্ষণিকভাবে সব সমস্যার সমাধান হয় না। পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক প্রচেষ্টা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। তবু তিনি বিশ্বাস করেন, বাস্তব সমস্যাগুলো যথাযথভাবে তুলে ধরা এবং সমাধানের লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাওয়াই ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রথম ধাপ।
ব্যক্তিগত অর্জন, ব্যবসায়িক সাফল্য ও সামাজিক পরিচিতির বাইরে আদন ইসলামের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষের জন্য কিছু করতে পারা। তিনি এমন একটি সমাজের স্বপ্ন দেখেন, যেখানে প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে কেউ অবহেলিত হবেন না, ভাষাগত সীমাবদ্ধতার কারণে কেউ প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হবেন না এবং তথ্যের অভাবে কোনো পরিবার অসহায় হয়ে পড়বে না। তাঁর বিশ্বাস, মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারাই জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য। নিউইয়র্ক স্টেটের প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর অধিকার ও কল্যাণে তাঁর এই প্রচেষ্টা বাংলাদেশি-আমেরিকান কমিউনিটির জন্যও অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।



















