Logo

আন্তর্জাতিক    >>   নীরা আর্য: ইতিহাসের বিস্মৃত এক বীরাঙ্গনা

নীরা আর্য: ইতিহাসের বিস্মৃত এক বীরাঙ্গনা

নীরা আর্য: ইতিহাসের বিস্মৃত এক বীরাঙ্গনা

সুলেখা পাল:
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু একটি অনন্য নাম। তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আজাদ হিন্দ ফৌজ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের এক নতুন অধ্যায় রচনা করেছিল। তবে এই ইতিহাসের অন্তরালে এমন বহু বীর ও বীরাঙ্গনা রয়েছেন, যাঁদের আত্মত্যাগ আজও যথাযথ স্বীকৃতি পায়নি। তাঁদের মধ্যে অন্যতম নীরা আর্য—যাঁকে বহু লেখক ও গবেষক আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রথম নারী গুপ্তচর হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
স্বাধীনতার সংগ্রামে নারীদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হলেই সাধারণত ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাই, ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী সাহগল, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার কিংবা মাতঙ্গিনী হাজরার নাম উচ্চারিত হয়। কিন্তু নীরা আর্যের অবদান তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত। অথচ তাঁর জীবন সাহস, আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমের এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত।
প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, নীরা আর্য নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর অত্যন্ত বিশ্বস্ত সহযোগীদের একজন ছিলেন। তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজের গোপন গোয়েন্দা কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন এবং ব্রিটিশদের নানা পরিকল্পনার তথ্য সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর কর্মজীবনের বহু তথ্য আজও সুসংরক্ষিত নয়। ফলে তাঁকে ঘিরে বিভিন্ন তথ্য ও ঘটনার বর্ণনায় কিছু মতভেদ রয়েছে। তবে এতে তাঁর দেশপ্রেম কিংবা স্বাধীনতার সংগ্রামে অংশগ্রহণের গুরুত্ব কমে যায় না।


নীরা আর্যকে নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি হলো নেতাজির জীবন রক্ষার জন্য তাঁর অসাধারণ আত্মত্যাগ। বিভিন্ন জীবনী ও স্মৃতিচারণে দাবি করা হয়েছে, তাঁর স্বামী ব্রিটিশ গোয়েন্দা বিভাগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং নেতাজির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে অংশ নেন। সেই পরিস্থিতিতে দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নীরা কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। যদিও এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ দলিলভিত্তিক প্রমাণ নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে, তবুও নীরা আর্যের অসীম সাহস ও দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন ওঠেনি।
ব্রিটিশ সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করে নির্মম নির্যাতন চালায়। বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ আছে, তাঁকে অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তবুও তিনি তাঁর সহযোদ্ধাদের পরিচয় কিংবা আজাদ হিন্দ ফৌজের গোপন তথ্য প্রকাশ করেননি। স্বাধীনতার জন্য এমন অবিচল মনোবল ইতিহাসে বিরল।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, স্বাধীনতার পর নীরা আর্য রাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রাপ্য সম্মান পাননি। জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি চরম আর্থিক সংকটে দিন কাটিয়েছেন বলে বিভিন্ন স্মৃতিকথা ও লেখায় উল্লেখ রয়েছে। এমনকি জীবিকা নির্বাহের জন্য তাঁকে ফুল বিক্রি করতে হয়েছে বলেও প্রচলিত রয়েছে। একজন স্বাধীনতা সংগ্রামীর জন্য এটি শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং জাতির স্মৃতিভ্রষ্টতার প্রতীক।
আজকের প্রজন্ম যখন স্বাধীনতার ইতিহাস জানার চেষ্টা করছে, তখন নীরা আর্যের মতো বিস্মৃত বীরাঙ্গনাদের সামনে নিয়ে আসা সময়ের দাবি। ইতিহাস কেবল বিজয়ীদের নয়, আত্মত্যাগীদেরও। তাঁদের স্মরণ না করলে স্বাধীনতার ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
নীরা আর্যের জীবন আমাদের শেখায়—দেশপ্রেম কখনো ব্যক্তিগত স্বার্থের কাছে মাথা নত করে না। স্বাধীনতার জন্য প্রয়োজন হলে একজন মানুষ নিজের সুখ, পরিবার, এমনকি জীবনও বিসর্জন দিতে পারেন। এই মূল্যবোধই তাঁকে ইতিহাসের এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
নতুন প্রজন্মের কাছে নীরা আর্যের জীবন ও সংগ্রাম তুলে ধরতে গবেষণা, পাঠ্যপুস্তক, প্রামাণ্যচিত্র এবং সাহিত্যচর্চার পরিধি আরও বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে তাঁর জীবন নিয়ে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক অনুসন্ধানও জরুরি, যাতে সত্যনিষ্ঠ তথ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যায়।
ইতিহাসের পাতা হয়তো সব নাম সমানভাবে মনে রাখে না। কিন্তু জাতির বিবেক যদি জাগ্রত থাকে, তবে নীরা আর্যের মতো বিস্মৃত বীরাঙ্গনারা কখনো হারিয়ে যান না। তাঁদের আত্মত্যাগই আমাদের স্বাধীনতার ভিত্তি, আর তাঁদের স্মরণ করাই ইতিহাসের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা।
সুলেখা পাল , সাধারণ সম্পাদক, মহিলা পরিষদ যুক্তরাষ্ট্র।