বঙ্গবন্ধু: দলীয় সীমা পেরিয়ে বাঙালি জাতির চিরন্তন সম্পদ
সাজ্জাদ হোসেন সবুজ:
বছর ঘুরে আবারও ফিরে এসেছে ১৭ মার্চ—বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক অনন্য আবেগ, গৌরব ও আত্মপরিচয়ের দিন। এই দিনেই ১৯২০ সালে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নিয়েছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর জন্মদিন কেবল একজন মহান নেতার জন্মবার্ষিকী নয়; এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, স্বাধীনতা ও জাতিসত্তার প্রতীক।
এবারের ১০৬তম জন্মবার্ষিকী উদযাপিত হচ্ছে এক ভিন্ন ও প্রতিকূল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নানা চক্রান্তের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক সরকার পতনের পর দেশে যে অস্থিরতা ও দমনমূলক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, তার ছায়া আজও বিদ্যমান। ২০০৯ সাল থেকে জাতীয় শিশু-কিশোর দিবস হিসেবে পালিত এই দিনটিও সাম্প্রতিক সময়ে বাতিল করা হয়েছে, যা জাতির চেতনাবিরোধী বলেই প্রতীয়মান হয়।
২০২৪ সালের জুলাই মাসের তথাকথিত বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পর ৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয় এবং ৮ আগস্ট একটি অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। এরপর থেকেই দেশে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির ওপর নেমে আসে দমন-পীড়নের কালো ছায়া। অসংখ্য নেতাকর্মী হত্যা, গ্রেপ্তার, মামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। দেশ যেন এক অঘোষিত কারাগারে পরিণত হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ দেশ ছেড়ে বিদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।
এই পরিস্থিতি নতুন নয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পরও একইভাবে ইতিহাস বিকৃতি, দমননীতি এবং সত্য গোপনের চেষ্টা হয়েছিল। দীর্ঘ ২১ বছর তাঁর জন্ম ও শাহাদাতবার্ষিকী পালনে বাধা দেওয়া হয়, নিষিদ্ধ করা হয় ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ। নতুন প্রজন্মকে বঞ্চিত করা হয় মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস থেকে।
কিন্তু ইতিহাসকে চিরদিন চাপা রাখা যায় না। আজকের ডিজিটাল যুগে, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, কোটি কোটি মানুষ দল-মত নির্বিশেষে বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করছে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়। ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁর জীবন, সংগ্রাম ও আদর্শ নিয়ে আলোচনা, বিশ্লেষণ ও শ্রদ্ধাঞ্জলি অব্যাহত রয়েছে। এটি প্রমাণ করে—বঙ্গবন্ধু কেবল একটি দলের নন; তিনি সমগ্র বাঙালি জাতির।
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে। ১৯৪০ সালে অল ইন্ডিয়া মুসলিম স্টুডেন্টস ফেডারেশনে যোগদান থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ছয় দফা, গণঅভ্যুত্থান—প্রতিটি আন্দোলনে তিনি ছিলেন অগ্রণী ভূমিকার অধিকারী। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পরও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তর না করলে, তিনি ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে স্বাধীনতার ডাক দেন। পরবর্তীতে তাঁর নেতৃত্বেই শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ, যার মাধ্যমে অর্জিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশ।
বঙ্গবন্ধুর অবদান আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। তাঁর ৭ মার্চের ভাষণ ইউনেস্কোর ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ তালিকায় স্থান পেয়েছে। বিশ্বনেতারাও তাঁর নেতৃত্ব ও ত্যাগের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো তাঁকে হিমালয়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি, প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ অসংখ্য নেতা তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেছেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারের ওপর আঘাত ছিল না; এটি ছিল বাঙালি জাতির অগ্রযাত্রার ওপর এক ভয়াবহ আঘাত। এরপর দীর্ঘদিন বিচারহীনতা ও ইতিহাস বিকৃতির মাধ্যমে জাতিকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলে, ইতিহাস তার সঠিক অবস্থানে ফিরে আসে।
বঙ্গবন্ধুর জীবন ছিল সংগ্রাম, ত্যাগ ও মানুষের মুক্তির জন্য এক অবিরাম লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি। তিনি নিজের জীবনের ১৪টি বছর কারাগারে কাটিয়েছেন মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে। তাঁর এই আত্মত্যাগ বাঙালি জাতির ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
প্রখ্যাত কবি অন্নদাশঙ্কর রায়ের ভাষায়—
“যতদিন রবে পদ্মা, মেঘনা, গৌরী, যমুনা বহমান,
ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।”
বঙ্গবন্ধু, বাংলা ভাষা, বাঙালি জাতি এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা—এগুলো একই সুতোয় গাঁথা। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি কল্পনা করা অসম্ভব। তাই বঙ্গবন্ধুকে অস্বীকার করা মানে নিজের ইতিহাস, স্বাধীনতা ও জাতিসত্তাকে অস্বীকার করা।
আজ তাঁর জন্মদিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক—বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলা। একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, সুখী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হওয়া।
কারণ বঙ্গবন্ধু কোনো দলের একার নন—তিনি সমগ্র বাঙালি জাতির চিরন্তন সম্পদ।
সাজ্জাদ হোসেন সবুজ


















