তিথিহীন পূজা নয়, প্রবাসেও চাই শুদ্ধ ধর্মাচার , ধর্মীয় শুদ্ধতার দাবিতে প্রবাসী হিন্দুদের প্রতিবাদ জোরদার
জয়দেব গাইন, প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক:
নিউ ইয়র্ক, লন্ডন, টরন্টো কিংবা সিডনির শহরতলিতে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসী বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের জীবনধারায় ধর্ম ও সংস্কৃতি গভীরভাবে মিশে আছে। দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে থেকেও তাঁরা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে থাকেন দুর্গাপূজা, কালীপূজা, লক্ষ্মীপূজা সহ নানা ধর্মীয় উৎসব ও রীতি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে একটি বিতর্কিত প্রবণতা গভীরভাবে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে প্রবাসের ধর্মচর্চাকে—তথাকথিত ‘সপ্তাহান্ত পূজা’। পূজার নির্দিষ্ট তিথি এড়িয়ে ছুটির দিন (শনি বা রবিবার) পূজা আয়োজন এখন অনেক মণ্ডপে সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিবর্তন অনেকের কাছে সুবিধাবাদী সিদ্ধান্ত হিসেবে ধরা পড়েছে। সময়ের সাথে মানিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনে এই আয়োজন জনপ্রিয় হলেও, ধর্মীয় শুদ্ধতা ও আচারবিধি বজায় রাখতে সচেতন প্রবাসীরা তীব্র আপত্তি তুলছেন। তাঁদের দাবি—তিথি ভঙ্গ করে পূজা আয়োজন ধর্মীয় শৃঙ্খলার লঙ্ঘন, এবং পূজার প্রকৃত তাৎপর্যকেই ক্ষুণ্ণ করে।
নিউ জার্সির বাসিন্দা এবং পুরোহিত শ্রী অনিরুদ্ধ চট্টোপাধ্যায় বলেন, “তিথি মেনে না করে যখন-তখন পূজা করলে তা শুধুই সামাজিক অনুষ্ঠান হয়ে দাঁড়ায়, ধর্মীয় পূজা নয়। এটি ধর্মের অপমান।”ব্রুকলিন গীতা সংঘের সদস্যা শর্মিষ্ঠা দে বলেন,
“আমরা প্রবাসেও যথাসাধ্য চেষ্টা করি ঘরে লক্ষ্মীপূজা বা সরস্বতীপূজা তিথি অনুযায়ী করতে। কিন্তু বড় পূজা কমিটিগুলো শুধু মানুষের জমায়েতের কথা ভেবে শাস্ত্রের নির্দেশনা মানে না—এটা অত্যন্ত কষ্টদায়ক।”ধর্মশাস্ত্র অনুসারে, প্রতিটি পূজা তিথি অনুযায়ী সম্পন্ন করা আবশ্যক।
“তিথি নির্ভর করিয়া যজমান পূজা করিবে”—এই নির্দেশ প্রতিটি ধর্মীয় আচারে মেনে চলা উচিত। বিশেষ করে দুর্গাপূজা, কালীপূজা বা শীতলাষ্ঠমীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পার্বণে তিথি উপেক্ষা করলে সেই পূজার ফল প্রশ্নবিদ্ধ হয়, এমনটাই বিশ্বাস।
এই প্রসঙ্গে নিউ ইয়র্কে ২০২৫ সালের জুন মাসে একাধিক হিন্দু সংগঠনের উদ্যোগে একটি স্বাক্ষর অভিযান ও গণচিঠি কর্মসূচি চালানো হয়। উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় বড় পূজা কমিটিগুলোকে তিথি অনুসারে পূজা আয়োজনের জন্য সচেতন ও বাধ্য করা। এই কর্মসূচিতে প্রায় ৫০০ জন প্রবাসী হিন্দু স্বাক্ষর করেছেন, যেখানে তাঁদের দাবিগুলোর মধ্যে ছিল—
পূজার সময় তিথি অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে ,প্রয়োজনে রাতে হলেও পূজা আয়োজন করা হোক ,পূজাকে সামাজিক উৎসব নয়, ধর্মীয় আচরণ হিসেবেই পালন করতে হবে ।সত্যিই, প্রবাসে পূজা আয়োজন সহজ নয়। সময়, স্থান, কর্মব্যস্ততা ও আর্থিক চ্যালেঞ্জ সব মিলিয়ে অনেক কিছুই বিবেচনায় রাখতে হয়। কিন্তু বর্তমান প্রযুক্তির যুগে আগেভাগে তিথি গণনা করে পূজার পরিকল্পনা করা কঠিন কিছু নয়।
পূজার সার্বজনীনতা ও মহিমা তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন তা ধর্মীয় শুদ্ধতা, সময়নিষ্ঠতা ও সংস্কৃতির মুল্যবোধকে সম্মান জানাবে। সামাজিক উৎসবের মোড়কে ধর্মের মূল উপাদানগুলো যেন বিলীন না হয়—এ হোক সকল সচেতন হিন্দুর প্রার্থনা।
বিশেষভাবে মনে করিয়ে দেওয়া দরকার—৪ঠা জুলাই কখনোই অন্য দিনে উদযাপিত হয় না।তবে ধর্মীয় উৎসবের তিথি কেন বদলে ফেলা হবে?
জয়দেব গাইন,
কলামিস্ট ও কমিউনিটির সনাতনী নেতা ,
নিউইয়র্ক , যুক্তরাষ্ট্র ।



















