বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ: জাতির মুক্তির অমর ডাক
মোহাম্মদ মকিস মনসুর:
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ সমগ্র জাতিকে মুক্তির মোহনায় দাঁড় করিয়েছিল। বাঙ্গালীর মুক্তির দিশারী, স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা, হাজার বছরের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সন্তান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বাঙালি জাতিকে আত্মোপলব্দির অঙ্গীকারের দিন উপহার দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই দিনটি বাঙালির সংগ্রাম, সাহস ও স্বাধীনতার চেতনার প্রতীক হিসেবে চিরস্মরণীয়।
আমি বঙ্গবন্ধুকে ব্যক্তিগতভাবে দেখার সৌভাগ্য পাইনি। কারণ আমি জন্মগ্রহণ করি ১৯৭০ সালে। যদি ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট তাঁর নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটত না, হয়তো আমাদের প্রজন্ম তাঁকে সরাসরি দেখার সৌভাগ্য পেত। তবুও স্কুলজীবন থেকেই বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে আমি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের একজন আদর্শিক কর্মী হিসাবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। এই ঐতিহাসিক ভাষণকে মুখস্থ করে ক্লাস নাইনের ছাত্র হিসেবে এক স্কুল ভিত্তিক অনুষ্ঠানে প্রথম পুরস্কারও অর্জন করেছিলাম।
১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান) বঙ্গবন্ধু জাতির উদ্দেশ্যে একটি অগ্নিমশাল ভাষণ দেন। ১০ লাখেরও বেশি মানুষ সেই বিকেল উপস্থিত ছিলেন। তাঁর ভাষণ বাঙালি জাতিকে সংগ্রামী চেতনায় উজ্জীবিত করেছিল, মুক্তির স্বপ্নে লালিত করেছিল, এবং পাকিস্তানি শোষকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছিল। এই ভাষণ বাঙালির অধিকার, স্বাধিকার ও স্বাধীনতার আন্দোলনের মূলমন্ত্রে পরিণত হয়।
বঙ্গবন্ধু সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা না করলেও পরবর্তী মুক্তিযুদ্ধের কৌশল নির্ধারণে তাঁর ভাষণ ছিল দিকনির্দেশক। “আপনারা সবই জানেন এবং বোঝেন” – এই সম্বোধনের মাধ্যমে তিনি জনতার সঙ্গে একাত্ম হন। তিনি তাদেরকে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার আহ্বান জানান, শত্রুর মোকাবিলায় জীবন উৎসর্গ করার প্রস্তুতি নিতে বলেন। তাঁর সতর্ক রাজনৈতিক কৌশল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সরাসরি আক্রমণ করতে বাধ্য করতে পারত না, তবে বাঙালি জনগণকে আত্মরক্ষা ও সংগ্রামে প্রস্তুত করেছিল।
৭ই মার্চের ভাষণ শুধুমাত্র বাংলাদেশের মানুষের হৃদয় নাড়েনি, এটি সমগ্র বিশ্বে প্রতিধ্বনিত হয়েছে। ইউনেস্কো এই ভাষণকে ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টার’-এ অন্তর্ভুক্ত করেছে। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ড. জ্যাকব এফ. ফিল্ডের সংকলিত গ্রন্থে ২৫০০ বছরের ৪১টি ইতিহাস সৃষ্টিকারী ভাষণের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ স্থান পায়, যা সত্যিকার অর্থেই বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ।
ভাষণটি আজও আমাদের জাতীয় জীবনের অনুপ্রেরণা। বঙ্গবন্ধু নেই, কিন্তু তাঁর দিকনির্দেশনা, সাহস, নেতৃত্ব ও মুক্তির চেতনা এখনও বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে আছে। এই ভাষণ শিক্ষা দেয় স্বাধীনতার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করার, মাথা নত না করার, অস্ত্রের মুখে দাঁড়িয়েও দেশমাতৃকার প্রশ্নে আপোষ না করার।
৭ই মার্চের ভাষণ যুগে-যুগে বাঙালিদের বিশ্বের বুকে আত্মমর্যাদা নিয়ে চলার এবং মা-মাতৃভূমির তরে সংগ্রামে অনুপ্রেরণা যোগাবে। এটি আমাদের ‘স্বাধীনতা’ শব্দের মালিকানা দেয়, মুক্তির চেতনা তৈরি করে এবং প্রতিটি প্রজন্মের জন্য সতর্কতা ও সাহসের প্রতীক হিসেবে চিরজীবী হয়ে থাকে।
১৯৭১ সালের সকল শহীদ ও নির্যাতিত মা-বোনদের প্রতি শ্রদ্ধা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও প্রণাম। মহান আল্লাহ্ যেন তাঁকে জান্নাতবাসী করেন।
জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।
মোহাম্মদ মকিস মনসুর
লেখক ও সাংবাদিক


















