ঐতিহাসিক ৭ মার্চ: শিকড় ছেঁড়ার সাধ্য কার?
- By N/A --
- 07 March, 2026
মানিক লাল ঘোষ:
বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক। ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দান—বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে—বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সেই ১৮ মিনিটের অলিখিত ভাষণ শুধু একটি বক্তৃতা ছিল না; সেটি ছিল একটি পরাধীন জাতির স্বাধীনতার মানচিত্র। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ইতিহাস মুছে ফেলার নানা অপচেষ্টার এই সময়ে সেই ভাষণের প্রতিটি শব্দ যেন আরও নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ছিল রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও রণকৌশলের এক অনন্য সংমিশ্রণ। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, “আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না, আমরা এদেশের মানুষের অধিকার চাই।” এই বক্তব্য ছিল ক্ষমতার মোহ ত্যাগ করে জনগণের অধিকারকে সর্বোচ্চ স্থানে তুলে ধরার এক বিরল দৃষ্টান্ত। একইসঙ্গে তিনি জাতিকে প্রস্তুতির আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। মনে রাখবা—রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ।” এই একটি বাক্যই যেন সাত কোটি নিরস্ত্র মানুষকে একটি সুশৃঙ্খল প্রতিরোধ শক্তিতে রূপান্তরিত করেছিল। আর ভাষণের শেষ অংশে উচ্চারিত সেই অমর ঘোষণা—“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”—প্রকৃত অর্থেই স্বাধীনতার পথরেখা এঁকে দিয়েছিল।
৭ মার্চের ভাষণ শুধু বাংলাদেশের ইতিহাসে নয়, বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসেও একটি অনন্য দলিল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর ইউনেস্কো এই ভাষণকে ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টার’-এ অন্তর্ভুক্ত করে ‘বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। কোনো লিখিত পাণ্ডুলিপি ছাড়া দেওয়া এই ভাষণটি পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক বক্তৃতা হিসেবে বিবেচিত। বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের কাছে বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠ কেবল বাংলাদেশের সম্পদ নয়; এটি শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ের এক চিরন্তন দলিল। কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রোসহ বহু বিশ্ববরেণ্য নেতা এই ভাষণের জাদুকরী শক্তির প্রশংসা করেছেন, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গৌরবকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কিছু সিদ্ধান্ত—বিশেষ করে ৭ মার্চের জাতীয় দিবসের মর্যাদা বাতিল বা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এর গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ—সচেতন মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। জাতীয় ক্যালেন্ডার থেকে ৭ মার্চকে সরিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা অনেকের কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে দুর্বল করার একটি প্রয়াস হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী—কোনো শাসকের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত দিয়ে জনগণের হৃদয়ে গেঁথে থাকা ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না। বরং এ ধরনের উদ্যোগ জাতীয় ঐক্যের পথকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
বর্তমান সময়টি মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তির জন্য এক কঠিন পরীক্ষা। তবে ৭ মার্চের ভাষণই হতে পারে তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রধান শক্তি। বঙ্গবন্ধু যেভাবে সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলে একটি জাতিকে জাগিয়ে তুলেছিলেন, আজও সেই চেতনা ধারণ করেই জনগণের মৌলিক সমস্যার কথা বলতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে ৭ মার্চের ভাষণের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব এবং এর ঐতিহাসিক সত্যতা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা অত্যন্ত জরুরি। একইসঙ্গে ভাষণে বঙ্গবন্ধুর উচ্চারিত অসাম্প্রদায়িক চেতনা—হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সবাইকে রক্ষার আহ্বান—আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
৭ মার্চের ভাষণ কোনো স্থির ইতিহাস নয়; এটি একটি জীবন্ত চেতনা। একে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান থেকে বাদ দিয়ে বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত দিয়ে এর শক্তি কমানো অসম্ভব। বরং যত বাধা আসবে, বঙ্গবন্ধুর সেই বজ্রকণ্ঠ ততই জোরালো হয়ে বাঙালির হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হবে। ৭ মার্চ কেবল একটি তারিখ নয়—এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের সনদ। কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা বা সাময়িক ক্ষমতার হিসাব এই কালজয়ী ইতিহাসকে ম্লান করতে পারবে না।
মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তির পুনর্জাগরণ মানেই বাংলাদেশের মূল চেতনার পুনরুত্থান। আর সেই পথচলায় ৭ মার্চের ভাষণই থাকবে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রেরণা ও পাথেয়।
মানিক লাল ঘোষ
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি ।


















