Logo

আন্তর্জাতিক    >>   মোহাম্মদ ইউনুস: নোবেলজয়ী থেকে বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব?

মোহাম্মদ ইউনুস: নোবেলজয়ী থেকে বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব?

মোহাম্মদ ইউনুস: নোবেলজয়ী থেকে বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব?

প্রাইমা হোসাইন:
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনায় একটি নাম বারবার সামনে আসে—ড. মোহাম্মদ ইউনুস। একসময় যিনি বিশ্বজুড়ে দারিদ্র্য বিমোচনের মডেল হিসেবে প্রশংসিত হয়েছিলেন, সেই ব্যক্তিকে ঘিরে আজ নানা প্রশ্ন, বিতর্ক এবং সমালোচনা উঠে এসেছে। একজন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ হিসেবে তার অর্জন যেমন অস্বীকার করা যায় না, তেমনি তার কর্মকাণ্ড নিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে ও বাইরে বিভিন্ন মহলে তীব্র সমালোচনাও রয়েছে।
ড. মোহাম্মদ ইউনুস ১৯৪০ সালে চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি লাভ করেন। স্বাধীনতার পর তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা শুরু করেন এবং দেশের গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের অর্থনৈতিক বাস্তবতা তাকে নতুনভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে।
১৯৭৬ সালে তিনি ক্ষুদ্রঋণের একটি পরীক্ষামূলক কর্মসূচি শুরু করেন, যা পরবর্তীতে গ্রামীণ ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ছিল দরিদ্র, বিশেষ করে গ্রামীণ নারীদের স্বল্প সুদে ঋণ দিয়ে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা। এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক প্রশংসা পায় এবং ২০০৬ সালে ড. ইউনুস ও গ্রামীণ ব্যাংক যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন।
তবে এই সাফল্যের পাশাপাশি তার কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্কও কম নয়। বিভিন্ন সময়ে তার বিরুদ্ধে আয়কর সংক্রান্ত জটিলতা, গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালন কাঠামো, এবং ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থার উচ্চ সুদের হার নিয়ে সমালোচনা উঠেছে। ২০১০ সালে নরওয়ের একটি তথ্যচিত্রে গ্রামীণ ব্যাংকের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলে বিষয়টি আন্তর্জাতিক আলোচনার জন্ম দেয়। যদিও পরে সংশ্লিষ্ট অনেক অভিযোগ সরকারিভাবে খতিয়ে দেখা হয় এবং বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক চলতে থাকে।
২০১১ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদ থেকে অপসারণ করে। সরকার তখন যুক্তি দেয় যে তিনি বয়সসীমা অতিক্রম করেছেন। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক মহলে আলোড়ন তোলে এবং অনেকেই এটিকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বলে উল্লেখ করেন। অপরদিকে দেশে তার সমালোচকরা বলেন, গ্রামীণ ব্যাংকের কাঠামো ও কার্যক্রম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন ছিল।
ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি নিয়েও বিশ্বজুড়ে মতবিরোধ রয়েছে। কেউ মনে করেন এটি দরিদ্র মানুষের ক্ষমতায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম, আবার কেউ মনে করেন অতিরিক্ত ঋণের বোঝা অনেক ক্ষেত্রে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে নতুন সমস্যায় ফেলেছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও ড. ইউনুসকে ঘিরে নানা মতভেদ রয়েছে। তার সমর্থকরা মনে করেন তিনি আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছেন এবং সামাজিক ব্যবসা বা “সোশ্যাল বিজনেস”-এর ধারণাকে বিশ্বে প্রতিষ্ঠা করেছেন। অন্যদিকে সমালোচকরা মনে করেন, আন্তর্জাতিক প্রভাব ও পশ্চিমা সমর্থনের কারণে তিনি দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে অস্বাভাবিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছেন।
ড. ইউনুসের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও বিভিন্ন সময়ে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। তার প্রথম স্ত্রী ছিলেন ভেরা ফোরস্টেনকো নামের একজন বিদেশি নাগরিক। পরবর্তীতে তিনি আফরোজা ইউনুসকে বিয়ে করেন। ব্যক্তিগত জীবন, ধর্মীয় পরিচয় কিংবা রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে নানা বিতর্ক থাকলেও সেগুলোর অনেকটাই মতামত বা ব্যক্তিগত ব্যাখ্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
বাস্তবতা হলো, ড. মোহাম্মদ ইউনুস বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত আলোচিত ও জটিল চরিত্র। একদিকে তিনি নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ, অন্যদিকে তার কর্মকাণ্ড নিয়ে দেশজুড়ে প্রবল মতভেদ রয়েছে। তার অবদান, সমালোচনা ও বিতর্ক—সব মিলিয়ে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবেন।
বাংলাদেশের জনগণের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দেশের গণতন্ত্র, উন্নয়ন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রাখা। সেই প্রেক্ষাপটে দেশের রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ভূমিকা, বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দলগুলোর কার্যক্রম ও দায়িত্ব নিয়ে জাতির প্রত্যাশা সবসময়ই বড় হয়ে থাকে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসই নির্ধারণ করবে—ড. মোহাম্মদ ইউনুসকে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কীভাবে মূল্যায়ন করবে: একজন দারিদ্র্য বিমোচনের উদ্ভাবক হিসেবে, নাকি বিতর্কিত আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে।
প্রাইমা হোসাইন, সমাজ সেবিকা ও সংগঠক।