Logo

আন্তর্জাতিক    >>   ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ: একটি ভাষণ, একটি জাতির জাগরণ, স্বাধীনতার পথে অমর আহ্বান

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ: একটি ভাষণ, একটি জাতির জাগরণ, স্বাধীনতার পথে অমর আহ্বান

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ: একটি ভাষণ, একটি জাতির জাগরণ, স্বাধীনতার পথে অমর আহ্বান

উত্তম কুমার সাহা: 
বাংলার ইতিহাসে এমন কিছু দিন আছে, যেগুলো কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়—সেগুলো একটি জাতির আত্মপরিচয়, সংগ্রাম ও স্বাধীনতার প্রতীক। ৭ই মার্চ তেমনই একটি দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লক্ষ লক্ষ মানুষের সামনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তা শুধু একটি রাজনৈতিক ভাষণ ছিল না; এটি ছিল স্বাধীনতার ডাক, মুক্তির ঘোষণা এবং বাঙালি জাতির ঐক্যের অমর দলিল।
১৯৭১ সালের মার্চ মাস। তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকদের বৈষম্য, শোষণ ও রাজনৈতিক প্রতারণায় ক্ষুব্ধ ছিল পূর্ব বাংলার মানুষ। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করেও বাঙালির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়নি। উত্তাল হয়ে ওঠে গোটা বাংলা। সেই অস্থির ও সংকটময় মুহূর্তে ৭ই মার্চ বিকেলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত হন এবং ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় ভাষণ প্রদান করেন।
সেই ভাষণে তিনি বলেছিলেন—
“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”
এই একটি বাক্যই যেন কোটি বাঙালির হৃদয়ে স্বাধীনতার আগুন জ্বালিয়ে দেয়। ভাষণের প্রতিটি শব্দ ছিল সাহস, প্রতিরোধ ও আশা জাগানোর আহ্বান। তিনি সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা না করেও বাঙালি জাতিকে প্রস্তুত করে দেন একটি চূড়ান্ত সংগ্রামের জন্য। তিনি প্রশাসন, কর্মচারী, ছাত্র, শ্রমিকসহ সকল শ্রেণির মানুষকে নির্দেশ দেন কিভাবে অসহযোগ আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে এবং কিভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
৭ই মার্চের ভাষণের পর থেকেই কার্যত পূর্ব বাংলা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় পরিচালিত হতে থাকে। পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে ওঠে। এই ভাষণই ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতির প্রধান প্রেরণা, যা ২৫ মার্চের কালরাত্রির পর পূর্ণাঙ্গ মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়।
এই ঐতিহাসিক ভাষণ শুধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসেই নয়, বিশ্ব ইতিহাসেও একটি অনন্য দলিল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০১৭ সালে ইউনেস্কো বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণকে “মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড” বা বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এর মাধ্যমে এই ভাষণ বিশ্ব মানবতার ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ স্থান লাভ করে।
৭ই মার্চ আমাদের মনে করিয়ে দেয় সাহস, নেতৃত্ব এবং জাতীয় ঐক্যের শক্তিকে। এটি কেবল অতীতের স্মৃতি নয়; এটি বাঙালির স্বাধীনতার চেতনার অবিনাশী প্রতীক। আজও যখন এই ভাষণ ধ্বনিত হয়, তখন মনে হয় যেন সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত আবার ফিরে এসেছে—যেখানে একটি জাতি তার মুক্তির স্বপ্নে জেগে উঠেছিল।
৭ই মার্চ তাই শুধু একটি দিন নয়, এটি বাঙালি জাতির আত্মমর্যাদা, সংগ্রাম এবং স্বাধীনতার চিরন্তন প্রেরণার দিন।

উত্তম কুমার সাহা 
সম্পাদক ও প্রকাশক 
প্রজ্ঞা নিউজ