আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই শান্তি ও স্থিতিশীলতার একমাত্র পথ: অবিচার, সহিংসতা ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে জনগণের জোর দাবি
প্রাইমা হোসাইন:
বাংলাদেশ আজ এক সংকটময় সময় অতিক্রম করছে—এমনটাই মনে করছেন দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন, সহিংসতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে বিতর্ক—সব মিলিয়ে সাধারণ নাগরিকের মনে প্রশ্ন জমেছে: দেশে কি সত্যিই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত আছে?
সাম্প্রতিক সময়ে আন্দোলন-সংঘাতকে কেন্দ্র করে প্রাণহানি, রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি এবং বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষাপটে অনেকে সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেছেন। নাগরিক সমাজের একটি বড় অংশের বক্তব্য—যে-ই হোক, যে দলেরই হোক, অপরাধ করলে তাকে প্রচলিত আইনের আওতায় এনে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও নিহতদের পরিবার যেন আইনি সহায়তা পায় এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়—এ দাবিও জোরালো হচ্ছে।
একই সঙ্গে দুর্নীতি, অপশাসন, চাঁদাবাজি, লুণ্ঠন ও অর্থপাচারের অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে। শেয়ারবাজারে অস্থিরতা, বিপুল অঙ্কের ঋণ বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রের সম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার প্রশ্নে অনেকেই প্রকাশ্যে জবাবদিহিতা চান। বিগত সময়ে সরকারের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত, আর্থিক লেনদেন ও আন্তর্জাতিক চুক্তি—এসব বিষয়ে স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দেওয়ার আহ্বান উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
রাজনৈতিক অধিকার প্রসঙ্গেও প্রশ্ন উঠেছে। দেশের একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর কার্যক্রম স্থগিত বা সীমিত করার অভিযোগ নিয়ে সমর্থকদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। তাদের দাবি—রাজনীতি করার সাংবিধানিক অধিকার দল ও জনগণের মৌলিক অধিকার; তা অবিলম্বে পুনর্বহাল করা প্রয়োজন। অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া দলীয় কর্মী-সমর্থকদের ক্ষেত্রে ন্যায্য বিচার ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবিও জোরদার হচ্ছে।
এছাড়া ঐতিহাসিক স্থাপনা ও মুক্তিযুদ্ধের স্মারক নিয়ে যে কোনো ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। ধানমন্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বরসহ জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য রক্ষায় রাষ্ট্রকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে—এমন মত প্রকাশ করেছেন অনেকে।
বিতর্কিত সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে জনমনে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তার জবাব স্বচ্ছ তদন্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই আসতে পারে। ব্যক্তিবিশেষ বা উপদেষ্টা পরিষদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ—সবকিছুর ক্ষেত্রেই প্রয়োজন নিরপেক্ষ অনুসন্ধান, যথাযথ সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং আদালতের রায়। কোনো পক্ষকে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, বরং আইনের মানদণ্ডে বিচার করার দাবিই আজ মুখ্য হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের মানুষ শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন চান। তারা চান—দুর্নীতি ও অবিচারের অবসান ঘটুক, গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করুক, রাজনৈতিক দলগুলো স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করুক এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত হোক।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং ন্যায়বিচারের নিরপেক্ষ প্রয়োগ—এই তিন ভিত্তির ওপরই টেকসই গণতন্ত্র দাঁড়িয়ে থাকে। আজকের এই উত্তাল সময়ে তাই প্রতিহিংসা নয়, প্রয়োজন সংলাপ; সংঘাত নয়, প্রয়োজন সাংবিধানিক সমাধান। রাষ্ট্র যদি সবার জন্য সমানভাবে আইন প্রয়োগ করতে পারে, তবেই দেশে প্রকৃত শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে—এটাই এখন সময়ের দাবি।
প্রাইমা হোসাইন, সমাজসেবিকা ও সংগঠক ।


















