মার্ক টালী: একাত্তরের কণ্ঠস্বর ও বাঙালির অকৃত্রিম বন্ধু
মানিক লাল ঘোষ:
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার আকাশে যখন বিজয়ের লাল-সবুজ পতাকা উড়ছিল, সেই আনন্দের ঢেউ কেবল বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তার স্পন্দন পৌঁছে গিয়েছিল লন্ডনের বুশ হাউস পর্যন্ত। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে বাংলাদেশের বিজয়ের কণ্ঠস্বর বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম কারিগর ছিলেন বিবিসির প্রখ্যাত সাংবাদিক স্যার মার্ক টালী। কলম ও কণ্ঠকে অস্ত্র বানিয়ে যিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে লড়াই করেছিলেন, তিনি কেবল একজন ব্রিটিশ সাংবাদিক নন—তিনি আমাদের মুক্তির ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন পূর্ব পাকিস্তানকে এক ভয়াবহ মৃত্যুপুরীতে পরিণত করেছিল, তখন বিশ্বজুড়ে পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে চলছিল পরিকল্পিত মিথ্যাচার ও আগ্রাসী প্রোপাগান্ডা। সেই অন্ধকার সময়ে সত্যের পক্ষে সবচেয়ে দৃঢ় ও নির্ভীক কণ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন মার্ক টালী। বিবিসিতে কর্মরত এই সাংবাদিক পাকিস্তানি রাষ্ট্রযন্ত্রের অপপ্রচারের দেয়াল ভেঙে বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছিলেন বিশ্বজনমতের সামনে।
মার্ক টালী
দিল্লিতে বিবিসির ব্যুরো প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি সীমান্ত পেরিয়ে আসা লাখ লাখ শরণার্থীর আর্তনাদ, শরণার্থী শিবিরের করুণ বাস্তবতা এবং রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের কথা ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরেন। তাঁর বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদনের কারণেই বিশ্ববাসী বুঝতে পেরেছিল—এটি কোনো ‘গৃহযুদ্ধ’ নয়; এটি ছিল একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার ঐতিহাসিক সংগ্রাম।
একাত্তরে বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে ‘আকাশবাণী’ ও ‘বিবিসি’ ছিল আশার বাতিঘর। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর যখন মার্ক টালীর ভরাট কণ্ঠে সংবাদ শিরোনাম ভেসে আসত, তখন গ্রামবাংলার মানুষ রুদ্ধশ্বাসে রেডিওর পাশে বসে থাকত। পাকিস্তানি রেডিওর মিথ্যাচারের চেয়ে তাঁর সংবাদই ছিল মানুষের কাছে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য।
রণাঙ্গনে যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের কাছেও মার্ক টালীর কণ্ঠ ছিল অনুপ্রেরণার উৎস। তাঁর সংবাদ ছিল অক্সিজেনের মতো—যা শুনে যোদ্ধারা সাহস পেতেন, বিশ্বাস করতেন বিশ্ব তাদের পাশে আছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যুদ্ধের ময়দান ও শরণার্থী শিবিরের যে চিত্র তিনি তুলে ধরেছিলেন, তা আজও ইতিহাসের অমূল্য দলিল হয়ে আছে।
একজন ব্রিটিশ নাগরিক হয়েও বাংলাদেশের প্রতি তাঁর মমত্ববোধ ছিল গভীর ও অকৃত্রিম। ২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকার যখন তাঁকে ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ প্রদান করে, তখন তিনি বলেছিলেন—বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা তাঁর জীবনের অন্যতম সেরা অর্জন। তিনি শুধু সংবাদ পরিবেশন করেননি; তিনি বাঙালির আবেগ, বেদনা ও বঞ্চনার ভাষাকে পৌঁছে দিয়েছিলেন বিশ্ববিবেকের দরবারে।
সত্যিই, “মার্ক টালী কেবল একজন সাংবাদিক নন—তিনি ছিলেন বাংলাদেশের অলিখিত রাষ্ট্রদূত।”
বিবিসির এই প্রখ্যাত সাংবাদিক ও বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু মার্ক টালী ৯০ বছর বয়সে গত ২৫ জানুয়ারি, রবিবার ভারতের নয়াদিল্লির একটি বেসরকারি হাসপাতালে (ম্যাক্স হাসপাতাল) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণে বাংলাদেশ এক অকৃত্রিম বন্ধুকে হারাল।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে মার্ক টালীর নাম চিরকাল অক্ষয় হয়ে থাকবে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা এবং আমাদের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসের পাতায় তিনি থাকবেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে। আজ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে বসবাস করতে পারার পেছনে তাঁর দুঃসাহসিক সাংবাদিকতার অবদান স্মরণ করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব।
মার্ক টালীর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
মানিক লাল ঘোষ, সাংবাদিক ও কলামিস্ট (ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি)।


















