বাংলাদেশের রাজনীতিতে নৈতিক আদর্শ বড়, না ক্ষমতা?
এম এ আলীম সরকার:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র দাখিলের আগমুহূর্তে বাংলাদেশের রাজনীতির যে চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, তা এক গভীর ও অস্বস্তিকর প্রশ্নের জন্ম দেয়—এই দেশে রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি কি নৈতিক আদর্শ, নাকি কেবল ক্ষমতা? সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা পর্যবেক্ষণ করলে অনিবার্যভাবে মনে হয়, আদর্শ নয়—ক্ষমতাই আজ বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্বের মধ্যে ন্যূনতম নৈতিকতা ও আদর্শিক অবস্থানের অভাব এখন আর সাধারণ মানুষের কাছে অজানা নয়। রাজনীতি এখানে ক্রমশ পরিণত হয়েছে ক্ষমতা ও সম্পদ অর্জনের হাতিয়ারে; জনগণের সার্বিক কল্যাণ রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু থেকে অনেক আগেই সরে গেছে।
ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আদর্শিক ও সাংগঠনিক দিক থেকে দুটি দল জনগণের কাছে স্বীকৃত ছিল—বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (বাম ধারা) এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী (ডান ধারা)। একসময় এই দুই দলের মধ্যেই আদর্শ, শৃঙ্খলা ও সাংগঠনিক স্বচ্ছতার পরিচয় পাওয়া যেত। কিন্তু সময়ের প্রবাহে সেই অবস্থানও বদলে গেছে।
কমিউনিস্ট পার্টি আজও সাধারণ মানুষের কথা বলার চেষ্টা করলেও দলটি কার্যত একটি সিভিল সোসাইটি সংগঠনের মতো হয়ে পড়েছে; সাংগঠনিক শক্তি ও রাজনৈতিক প্রভাব ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী হলেও আদর্শিকভাবে গভীর সংকটে নিপতিত। পরিহাসের বিষয় হলো—বাম সংগঠনগুলো এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কৌশলই জামায়াতকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে। জামায়াতের বিরুদ্ধে যত আক্রমণ হয়েছে, তারা ততই সংগঠিত হয়েছে।
তবে বর্তমান জামায়াতে ইসলামী আর মওদুদী-প্রতিষ্ঠিত আদর্শিক কাঠামোর মধ্যে নেই। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, তাদের ধর্মনির্ভর রাজনীতি ক্রমেই রূপ নিচ্ছে মুসলিম লীগীয় ধারার এক বাস্তববাদী ক্ষমতামুখী রাজনীতিতে। ইসলাম তাদের কাছে আর রাজনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি নয়; বরং ক্ষমতায় যাওয়ার একটি উপকরণে পরিণত হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ব্যক্তিগতভাবে একজন ভদ্র, নম্র ও উদার রাজনৈতিক নেতা—এ কথা স্বীকার করতেই হয়। তার উদার রাজনৈতিক বক্তব্য প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু একই সঙ্গে বাস্তবতা হলো, জামায়াত এখন ক্ষমতায় যাওয়ার লক্ষ্যে নিজস্ব আদর্শ বিসর্জন দিয়ে হিন্দু কমিটি গঠন করছে, অমুসলিম প্রার্থীকে মনোনয়ন দিচ্ছে এবং ঘোষণা দিচ্ছে—ক্ষমতায় গেলে শরিয়াভিত্তিক রাষ্ট্র নয়, বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালিত হবে।
এই দ্বিমুখী নীতি জামায়াতের ঘোষিত দর্শন ও কর্মীদের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। শরিয়াভিত্তিক রাষ্ট্রের কথা বলা দলটি যখন ক্ষমতার প্রয়োজনে সেই অবস্থান থেকে সরে আসে, তখন স্পষ্ট হয়—আদর্শের চেয়ে ক্ষমতাই বড় হয়ে উঠেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের অবস্থানও একই প্রবণতার সাক্ষ্য দেয়। দল ভেঙে প্রতীক বদল, আদর্শ বিসর্জন দিয়ে জোট পরিবর্তন, বিএনপি কিংবা জামায়াতের সঙ্গে দরকষাকষি—সব মিলিয়ে রাজনীতির চরিত্র হয়ে উঠেছে চরম সুবিধাবাদী।
বিএনপি জোট রাজনীতিতে কিছুটা রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিলেও ৫ আগস্টের পর তাদের নেতৃত্বের দুর্বলতা রাষ্ট্রকে ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেয়। মব সহিংসতা, আইনহীনতা ও রাষ্ট্রীয় শূন্যতা প্রমাণ করে—রাজনৈতিক শক্তি দায়িত্বশীল না হলে রাষ্ট্র কতটা বিপর্যস্ত হতে পারে।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর “বিপ্লব”, “দ্বিতীয় স্বাধীনতা” কিংবা “নতুন বাংলাদেশ”—এ ধরনের শব্দচয়নের মাধ্যমে জাতিকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। প্রকৃত অর্থে বিপ্লব ও স্বাধীনতার মানে কী, তা জেনেও এই মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে খুব কম মানুষই কলম ধরেছেন। সময়ের নিয়মেই এই শব্দগুলো আজ হারিয়ে গেছে।
ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর জনগণ আশা করেছিল—সত্য, ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু বাস্তবে গত ১৫ মাসে মব সহিংসতা, সাংবাদিক নির্যাতন, গণমাধ্যমে হামলা, শিক্ষকদের লাঞ্ছনা—সবকিছুই ঘটেছে রাষ্ট্রীয় নিষ্ক্রিয়তার মধ্য দিয়ে। রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব—নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—এই অন্তর্বর্তী সরকার তা পালনে ব্যর্থ হয়েছে।
এর ফল ভয়াবহ। বিনিয়োগ থেমে গেছে, অর্থনীতি ভঙ্গুর, বেকারত্ব বাড়ছে, যুবসমাজ হতাশ। রাষ্ট্রীয় আস্থার জায়গা ভেঙে পড়েছে। এই বাস্তবতায় আজ সাধারণ মানুষের মনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—রাজনীতিবিদদের কাছে নৈতিক আদর্শ বড়, না ক্ষমতা?
দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়েও এই প্রশ্নের আশাব্যঞ্জক উত্তর পাওয়া যায় না। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ কিংবা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে রাজনীতি ছিল আদর্শনির্ভর। আজ সেই জায়গা দখল করেছে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি—যেখানে নীতি, নৈতিকতা ও জনগণের স্বার্থ গৌণ।
আদর্শহীন রাজনীতি রাষ্ট্র পরিচালনাকে দুর্বল করে, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে বাধা দেয় এবং জনগণকে রাজনীতি-বিমুখ করে তোলে। রাজনীতিবিদরা তখন জনগণের চোখে পরিণত হয় ক্ষমতালোভী এক অলিগার্কিতে।
এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ এখনও আছে। প্রয়োজন—
•রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও নৈতিক চর্চা জোরদার করা
•তরুণদের আদর্শিক শিক্ষার মাধ্যমে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করা
•জনগণের পক্ষ থেকে নৈতিকতাহীন ক্ষমতার রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করা
ক্ষমতার ওপরে যদি আদর্শকে স্থান দেওয়া যায়, তবে রাজনীতি আবার মানুষের আস্থা ও সম্মানের জায়গা হয়ে উঠতে পারে। অন্যথায় ক্ষমতার রাজনীতি বাংলাদেশকে আরও গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দেবে।
দেশের সর্বজনীন কল্যাণের জন্য ক্ষমতার চেয়ে আদর্শকে অগ্রাধিকার দেওয়াই সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। কারণ রাষ্ট্র পরিচালিত হয় সরকার দ্বারা, সরকার গঠিত হয় রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে—আর বাংলাদেশের উন্নতির জন্য রাজনৈতিক সংস্কারই সবচেয়ে জরুরি।
এম এ আলীম সরকার
প্রাবন্ধিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
সভাপতি, বাংলাদেশ গণমুক্তি পার্টি (বিজিপি)


















