বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্রমবর্ধমান সংকট পর্যালোচনা করল দ্য হেগ
প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক :
বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান মানবাধিকার লঙ্ঘন, সহিংসতা ও বিচারহীনতার উদ্বেগজনক পরিস্থিতি নিয়ে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। গ্লোবাল হিউম্যান রাইটস ডিফেন্স (GHRD)-এর উদ্যোগে আয়োজিত এই সম্মেলনে নীতিনির্ধারক, মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক ও সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সম্মেলনে ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সংঘটিত গণহিংসা, হত্যা, অগ্নিসংযোগ, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মৌলিক অধিকার ক্ষয়ের ধারাবাহিক চিত্র তুলে ধরা হয়। আলোচকরা বলেন, এসব সহিংসতা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের অধীনে জীবন, নিরাপত্তা, সম্পত্তি ও ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন এবং রাষ্ট্রের প্রতিরোধ ও শাস্তি নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতার প্রশ্ন তোলে।
সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্যে ড. অ্যান্থনি হোলস্লাগ ধর্ম অবমাননা আইন, প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ক্রিয়তা ও সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সহিংসতার পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেন। তিনি বলেন, কার্যকর জবাবদিহির অভাব ও আইনি কাঠামোর অপব্যবহার এমন এক পরিস্থিতির জন্ম দিচ্ছে, যাকে অনেক গবেষক ‘ক্রমাগত গণহত্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করছেন।
আলোচনায় বাংলাদেশের আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা তুলে ধরা হয়, যেখানে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমতার প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। বক্তারা বলেন, ধর্ম অবমাননা সংশ্লিষ্ট বিধানসহ বিভিন্ন আইন ও প্রশাসনিক চর্চা অনেক ক্ষেত্রে সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পরিবর্তে বিচারহীনতাকে উৎসাহিত করছে। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও ডেমোক্রেটিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেও জমি দখল, দীর্ঘমেয়াদি আটক এবং ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঘটনা ঘটছে।
সম্মেলনে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকাও গুরুত্বসহকারে আলোচিত হয়। যাচাই-বিহীন অভিযোগ ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় অনেক ক্ষেত্রে গণহিংসা উসকে উঠছে বলে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এসব ঘটনার সীমিত কাভারেজের কারণে বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ছে বলেও বক্তারা মত দেন। তবে নাগরিক সমাজ, স্বাধীন সাংবাদিকতা ও প্রবাসী কমিউনিটির উদ্যোগকে নীরবতা ভাঙার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
আন্তর্জাতিক পরিসরে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন সংস্থার ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হয়। অংশগ্রহণকারীরা বলেন, বাংলাদেশে সংঘটিত ঘটনাগুলো সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তিসমূহের গুরুতর লঙ্ঘনের ইঙ্গিত বহন করে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে অনেক সময় মানবাধিকার প্রশ্নে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেরি হলেও, ধারাবাহিক নজরদারি ও নীতিনিষ্ঠ আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা অপরিহার্য।
সম্মেলনের সমাপনী বক্তব্যে GHRD-এর হেড কো-অর্ডিনেটর উইক্টোরিয়া ওয়ালচিক বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানিক অঙ্গীকার ও সংখ্যালঘুদের বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্যে ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রমাণভিত্তিক আন্তর্জাতিক নজরদারি, জবাবদিহি এবং মানবাধিকার আইনের কার্যকর প্রয়োগ জরুরি।
সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরা একমত হন যে বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা কেবল একটি অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দায়বদ্ধতার অংশ। দ্য হেগের এই সম্মেলন সহিংসতার ধরন, রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা এবং আন্তর্জাতিক দায়িত্ব সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ও দলিলভিত্তিক চিত্র তুলে ধরেছে, যা ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক উদ্যোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হবে।


















