Logo

সাহিত্য সংস্কৃতি    >>   সংগ্রামী চেতনার দুই বাতিঘরকে স্মরণ: গান–আবৃত্তি–আলোচনায় রণেশ দাশগুপ্ত ও বদিউর রহমানের জন্মবার্ষিকী উদযাপন উদীচীর

সংগ্রামী চেতনার দুই বাতিঘরকে স্মরণ: গান–আবৃত্তি–আলোচনায় রণেশ দাশগুপ্ত ও বদিউর রহমানের জন্মবার্ষিকী উদযাপন উদীচীর

সংগ্রামী চেতনার দুই বাতিঘরকে স্মরণ: গান–আবৃত্তি–আলোচনায় রণেশ দাশগুপ্ত ও বদিউর রহমানের জন্মবার্ষিকী উদযাপন উদীচীর

প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক :
গান, আবৃত্তি ও স্মৃতিচারণার আবেশঘন আয়োজনে বাংলার প্রগতিশীল আন্দোলনের দুই উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব—বিশিষ্ট সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও মার্কসবাদী তাত্ত্বিক, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা রণেশ দাশগুপ্ত-এর ১১৪তম এবং উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সদ্য প্রয়াত সভাপতি, শিক্ষাবিদ ও চিন্তক অধ্যাপক বদিউর রহমান-এর ৭৯তম জন্মবার্ষিকী শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় উদযাপন করেছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী।

গত ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় রাজধানীর পুরানা পল্টনে অবস্থিত কমরেড মনি সিংহ–ফরহাদ স্মৃতি ট্রাস্ট ভবনের ৬ষ্ঠ তলায় আয়োজিত হয় ‘জন্মবার্ষিকীর আয়োজন’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের শুরুতেই উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের নেতৃবৃন্দ রণেশ দাশগুপ্ত ও বদিউর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে উদীচী কেন্দ্রীয় সঙ্গীত বিভাগের শিল্পীরা সম্মেলক কণ্ঠে পরিবেশন করেন আবেগঘন গান—“কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে তুমি ধরায় আসো”।
উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহমুদ সেলিম-এর সভাপতিত্বে শুরু হয় আলোচনা পর্ব। পর্বের শুরুতে উদীচী কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য কংকন নাগ পাঠ করেন অধ্যাপক বদিউর রহমানের জীবনী এবং সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য শেখ আনিসুর রহমান পাঠ করেন রণেশ দাশগুপ্তের জীবনী।


বদিউর রহমানের জীবনী পাঠে তাঁকে আদর্শিক লড়াইয়ের এক অবিচল সৈনিক হিসেবে তুলে ধরা হয়। বলা হয়, তিনি ছিলেন একাধারে শিক্ষাবিদ, গবেষক, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, সম্পাদক ও সাংবাদিক—যিনি শৈশব থেকেই মানবমুক্তির সংগ্রামে দীক্ষিত হয়ে আমৃত্যু সাম্যবাদ, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে গেছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের চার মূলনীতির প্রতি তাঁর গভীর আস্থা ছিল এবং বাহাত্তরের সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী যেকোনো অপপ্রচারের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন দৃঢ় ও সোচ্চার।
রণেশ দাশগুপ্তের জীবনীতে তাঁর জীবনকে তুলে ধরা হয় নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি হিসেবে। শৈশব থেকে মৃত্যু অবধি সংগ্রামই ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র পথ। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা ও কমিউনিস্ট রাজনীতির কারণে বারবার কারাবরণ, ত্যাগ ও নির্লোভ জীবনের মধ্য দিয়ে তিনি এক মহান আদর্শের প্রতি সম্পূর্ণ আত্মনিবেদন করেছিলেন। তাঁর জীবন আজও বিস্ময় জাগায়—একজন মানুষ কীভাবে ব্যক্তিগত সব চাওয়া-পাওয়া বিসর্জন দিয়ে সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্নে নিজেকে উৎসর্গ করতে পারেন।


আলোচনা পর্বে আরও বক্তব্য রাখেন সৈয়দ আজিজুল হক মাসুম, উদীচীর সাবেক সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম সিদ্দিক রানা, কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সভাপতি শিবানী ভট্টাচার্য, সদস্য বিমল মজুমদার, সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য আজমীর তারেক চৌধুরী এবং অধ্যাপক বদিউর রহমানের জ্যেষ্ঠ সন্তান সুপা সাদিয়া। পুরো অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে।
আলোচনা পর্বের সূচনায় অমিত রঞ্জন দে বলেন,
“রণেশ দাশগুপ্ত ছিলেন একাধারে তুখোড় সাংবাদিক, বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও অসামান্য প্রাবন্ধিক। তিনি তাঁর জীবন দিয়ে আমাদের শিখিয়েছেন—কীভাবে সৎ থেকে, আদর্শে অবিচল থেকে সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রামে যুক্ত থাকতে হয়।”


আজিজুল হক মাসুম বলেন, “ভোগ নয়, ত্যাগের আদর্শকে ধারণ করেই রণেশ দাশগুপ্ত আজীবন সমাজতান্ত্রিক স্বপ্নের পথে হেঁটেছেন। আর অধ্যাপক বদিউর রহমান সংসার জীবনে থেকেও নিজ আদর্শের সঙ্গে কখনো আপস করেননি।”
অন্যান্য বক্তারা বলেন, সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে বিপর্যয়ের সময়েও রণেশ দাশগুপ্ত তাঁর লেখনীর মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে সংগ্রামের মাঠে থাকার প্রেরণা দিয়েছেন। ১৯৬৮ সালের ২৯ অক্টোবর শিল্পী-সংগ্রামী সত্যেন সেনসহ প্রগতিশীল চিন্তার মানুষদের নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। তাঁর দেখানো পথেই উদীচীকে এগিয়ে নিতে আজীবন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন অধ্যাপক বদিউর রহমান।
তাঁরা আরও বলেন, দেশের মানুষ বারবার অধিকার আদায়ে রাজপথে রক্ত দিলেও বহুবার প্রতারিত হয়েছে। সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পরও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হওয়ায় সচেতন মানুষকে আরও সংগঠিত ও সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান বক্তারা।


অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পর্বে উদীচীর শিল্পীরা পরিবেশন করেন “হে মহামানব একবার এসো ফিরে”, “ধিতাং ধিতাং বোলে”, *“আমরা পূবে-পশ্চিমে”*সহ একাধিক সমবেত সঙ্গীত। উদীচী কেন্দ্রীয় আবৃত্তি বিভাগের শিল্পীরা পরিবেশন করেন বৃন্দ আবৃত্তি “রানার চলেছে” এবং একক আবৃত্তি পরিবেশন করেন সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য শিখা সেনগুপ্তা।
অনুষ্ঠানটি পরিণত হয় সংগ্রাম, সংস্কৃতি ও প্রগতিশীল চেতনার এক গভীর স্মরণসভায়—যেখানে রণেশ দাশগুপ্ত ও বদিউর রহমানের জীবনাদর্শ নতুন প্রজন্মের কাছে আবারও প্রেরণার বাতিঘর হয়ে ওঠে। ছবি : রতন কুমার দাস