Logo

রাজনীতি    >>   সরকারের উদাসীনতার কারণে মব সহিংসতা ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে—এম এ আলীম সরকার

সরকারের উদাসীনতার কারণে মব সহিংসতা ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে—এম এ আলীম সরকার

সরকারের উদাসীনতার কারণে মব সহিংসতা ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে—এম এ আলীম সরকার

প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক:

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে আইনের শাসনের পরিবর্তে প্রত্যেক সরকারই কর্তৃত্ববাদী শাসন চালু করে আসছে। যার কারণে জনগণের সরকার না হয়ে কোনো কোনো সরকার কর্তৃত্ববাদী থেকে স্বৈরাচারী সরকারে পরিনত হয়েছে। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা ১৬ বছরের শাসনে আইনের অপপ্রয়োগ করে গুম, খুন ও মিথ্যা মামলা দিয়ে ভয়ের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত করেন। গত বছরের জুলাই-আগস্টে কোটাসংস্কার আন্দোলন রূপ নেয় বৈষম্যবিরোধী  আন্দোলনে। আবু সাঈদ নিহত হওয়ার পর সরকার পতনের তীব্র আন্দোলনের মুখে ছাত্র-শ্রমিক-কৃষক  জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা গত বছরের ৫ আগস্টে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বে ৮ আগস্টে এনজিও, সিভিল সোসাইটি ও ছাত্র  প্রতিনিধিদের নিয়ে শপথ গ্রহণের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হয়। উপদেষ্টা পরিষদের প্রধান হন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুস। 
১৪০০ জনের রক্তের ত্যাগের বিনিময়ে অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। জাতির প্রত্যাশা ছিল পেশাজীবি, আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী  সাংবাদিক, শিক্ষক ও রাজনীতিবিদদের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় সরকার। জাতীয় সরকার গঠন না করার কারণে এই অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করার পর থেকে সমাজে, গ্রামেগঞ্জে, শহরে, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও আদালতের বিচারক কার্যালয় সহ সর্বক্ষেত্রে মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। সরকারের উচিত ছিল আইনশৃঙ্খলা ও বাজারব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া।  বানিজ্য  ও অর্থ উপদেষ্টা দু'জনই অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে সফলভাবে বাজারব্যবস্থা ও আর্থিকব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। সেক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র ও আইন উপদেষ্টা দু'জনই আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছেন। 

আইনের শাসন একটি রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে যে হারে মব সহিংসতা বাড়ছে, তা সেই ভিত্তিকেই নাড়িয়ে দিচ্ছে। প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ছায়ানট, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কার্যালয়ে পরিকল্পিত হামলা, নিউ এজ সম্পাদক নুরুল কবিরকে হেনস্তা, ভালুকায় সনাতনী ধর্মের একজনকে শতলোকের সামনে গাছে ঝুলিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করা ও লক্ষীপুরে বিএনপির এক নেতার ঘরে রাতে বাহিরে তালা দিয়ে আগুনে পুড়িয়ে শিশুহত্যা করাসহ মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, তা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে ব্যাপকভাবে সমালোচনা  হয়েছে। সরকারের উদাসীনতার কারণেই এই মব সহিংসতা ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে, যা জাতির জন্য অশুভ ।  এই মব সহিংসতা সরকারকে কঠোরহস্তে দমন করতে হবে। উদ্বেগের বিষয় হলো—এই সহিংসতা কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা ক্রমেই একটি সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হচ্ছে। আর এই পরিস্থিতির জন্য সরকারের উদাসীনতা ও দুর্বল অবস্থান বড় মাত্রায় দায়ী। মব সহিংসতা মূলত তখনই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, যখন মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে রাষ্ট্র তাদের ন্যায়বিচার দিতে ব্যর্থ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষ ও কার্যকর ভূমিকা না থাকলে সাধারণ মানুষ নিজ হাতে বিচার করতে উৎসাহিত হয়। কিন্তু একটি সভ্য রাষ্ট্রে “নিজ হাতে বিচার” কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এটি শুধু একজন ব্যক্তির অধিকার হরণ করে না, পুরো সমাজকে অস্থিতিশীল করে তোলে। দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক ক্ষেত্রে মব সহিংসতার ঘটনার পর দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে সরকার ব্যর্থ হচ্ছে। কোথাও রাজনৈতিক প্রভাব, কোথাও প্রশাসনিক গাফিলতি, আবার কোথাও ইচ্ছাকৃত নীরবতা—সব মিলিয়ে অপরাধীরা বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে। ফলে একটি বিপজ্জনক বার্তা ছড়িয়ে পড়ছে: মব সহিংসতায় জড়ালেও শাস্তি এড়ানো সম্ভব। আরেকটি বড় সমস্যা হলো গুজব ও ভ্রান্ত তথ্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অসত্য খবর মুহূর্তের মধ্যে জনতাকে উত্তেজিত করে তোলে। কিন্তু এই গুজব নিয়ন্ত্রণে সরকারের উদ্যোগ খুবই সীমিত। তথ্য যাচাই ও দ্রুত সরকারি ব্যাখ্যার অভাবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। সরকারের দায়িত্ব শুধু আইন প্রয়োগে সীমাবদ্ধ নয়; জনগণের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা আরও জরুরি। এর জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করতে হবে—মব সহিংসতা কোনো সমাধান নয়, বরং এটি আরও অন্যায়ের জন্ম দেয়।
মব সহিংসতা যদি এখনই কঠোরভাবে দমন না করা যায়, তবে ভবিষ্যতে এর পরিণতি আরও ভয়াবহ হবে। একটি রাষ্ট্র যেখানে জনতা আইনের বিকল্প হয়ে ওঠে, সেখানে নাগরিক নিরাপত্তা বলতে কিছু থাকে না। তাই এখনই সময়—সরকারকে উদাসীনতা ঝেড়ে ফেলে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। অন্যথায় ইতিহাস এই নীরবতার জন্য কাউকে ক্ষমা করবে না।

লেখকঃএম এ আলীম সরকার : প্রাবন্ধিক ও রাজনীতিবিদ, সভাপতি, বাংলাদেশ গণমুক্তি পার্টি (বিজিপি)