২০ জানুয়ারি—পল্টন ট্র্যাজেডির ২৫ বছর: রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা, বিচারহীনতা ও গণতন্ত্রের রক্তাক্ত স্মৃতি
মানবেন্দ্র দেব:
আজ ২০ জানুয়ারি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গভীর ক্ষতচিহ্ন বহনকারী দিন। ২০০১ সালের এই দিনে ঢাকার পল্টন ময়দানে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-র শান্তিপূর্ণ মহাসমাবেশে যে বর্বরোচিত বোমা হামলা সংঘটিত হয়েছিল, তা ছিল কেবল একটি রাজনৈতিক সমাবেশে আঘাত নয়—এটি ছিল মতপ্রকাশ, সংগঠিত গণআন্দোলন ও শ্রমজীবী মানুষের অধিকারকে স্তব্ধ করার সুপরিকল্পিত প্রয়াস।
আজ সেই নৃশংস ঘটনার ২৫ বছর পূর্তি—রজতজয়ন্তী। আড়াই দশক পেরিয়ে গেলেও পল্টনের রক্তাক্ত স্মৃতি আমাদের বিবেককে নাড়িয়ে দেয়। গণতান্ত্রিক রাজনীতির পরিসরে সহিংসতার যে বিষবৃক্ষ সেদিন রোপিত হয়েছিল, তার ফল আজও সমাজ ও রাষ্ট্রকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।
সেদিন প্রাণ হারিয়েছিলেন পাঁচজন সাহসী কর্মী—যাঁরা মেহনতি মানুষের অধিকার, সামাজিক ন্যায় ও সাম্যের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে রাজপথে রক্ত দিয়েছেন। শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি পল্টন ট্র্যাজেডির পাঁচ শহীদকে:
হিমাংশু মণ্ডল, আব্দুল মজিদ, আবুল হাসেম, মোক্তার হোসেন ও বিপ্রদাস রায়।
এই হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না; এটি ছিল ভিন্নমত দমন ও প্রগতিশীল রাজনীতিকে ভয় দেখানোর ধারাবাহিক কৌশলের অংশ। রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিচারের আওতায় আনা। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো—২৫ বছর পেরিয়েও এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিচার ও দণ্ড কার্যকর হয়নি। এই বিচারহীনতাই সহিংসতাকে উৎসাহিত করে, অপরাধীদের সাহস জোগায় এবং গণতন্ত্রকে দুর্বল করে।
পল্টন ট্র্যাজেডি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—গণতন্ত্র কেবল ভোটের প্রক্রিয়া নয়; এটি নাগরিকের নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে রাষ্ট্রের নিরপেক্ষ সুরক্ষার নিশ্চয়তা। বিচারহীনতা যত দীর্ঘায়িত হয়, ততই রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা স্পষ্ট হয়।
এই রজতজয়ন্তীতে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত—শহীদদের স্মৃতিকে আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে বিচার প্রতিষ্ঠার লড়াইকে জোরদার করা। সত্য উদ্ঘাটন, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সহিংসতা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণই হতে পারে পল্টনের শহীদদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা।
পল্টন ট্র্যাজেডি ইতিহাসের একটি কালো অধ্যায়—কিন্তু সেই অধ্যায় থেকে শিক্ষা নিয়ে ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্রের পথে দৃঢ়ভাবে এগোনোর দায় আজও আমাদের সবার।
মানবেন্দ্র দেব, রাজনৈতিক নেতা ও গাজীপুর-৪ ( কাপাসিয়া ), নির্বাচনী প্রার্থী।


















