বাংলাদেশ: জাতীয় সম্পদ লুণ্ঠনের স্বর্গরাজ্য
এম এ আলীম সরকার:
বাংলাদেশের অর্থনীতি একদিকে সম্ভাবনাময়, অন্যদিকে গভীর সংকটে নিমজ্জিত। স্বাধীনতার পর থেকে স্বনির্ভর ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতি গড়ার চেষ্টা চললেও বাস্তবে আমরা দেখছি—জাতীয় সম্পদের বিকাশ এবং জাতীয় সম্পদের অবাধ লুণ্ঠন একসঙ্গে সমান্তরালভাবে চলছে। একদিকে কৃষক, শ্রমিক, প্রবাসী, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোগীরা উৎপাদন ও রপ্তানির মাধ্যমে অর্থনীতির ভিত শক্ত করছেন, অন্যদিকে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ, ব্যাংক লুটেরা ব্যবসায়ী ও আমলাতান্ত্রিক অলিগার্কি রাষ্ট্রীয় সম্পদ নির্বিঘ্নে আত্মসাৎ করছে।
ঐতিহাসিকভাবে এই শোষণের শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। ব্রিটিশ শাসনের আগের বাংলা ছিল মোগল সাম্রাজ্যের সবচেয়ে সমৃদ্ধ অঞ্চল। কিন্তু ঔপনিবেশিক শাসনের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতির মাধ্যমে বাংলা ধ্বংসের পথে ঠেলে দেওয়া হয়। মুসলমান সমাজকে প্রশাসন, শিক্ষা, চাকরি ও ব্যবসা থেকে পরিকল্পিতভাবে বিতাড়িত করা হয়। ইতিহাসবিদ উইলিয়াম হান্টার ১৮৭১ সালেই উল্লেখ করেছিলেন যে এক সময় বাংলার কোনো মুসলমান অভিজাতের দারিদ্র্যে পতন অসম্ভব ছিল, অথচ তখন সম্পদশালী মুসলমান প্রায় বিলুপ্ত। এই বৈষম্যই পাকিস্তান আন্দোলনের পটভূমি তৈরি করে। তবে পাকিস্তান রাষ্ট্রে এবং পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশেও অর্থনৈতিক মুক্তির প্রশ্নটি উপেক্ষিত থেকে যায়। ফলে একটি সুবিধাভোগী ধনী শ্রেণি রাষ্ট্রক্ষমতার ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে ওঠে, যারা আজ রাষ্ট্র ও রাজনীতির প্রধান সংকট।
স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়েও কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের মুক্তি আসেনি। বাস্তবে বাংলাদেশে মাত্র ৫ শতাংশ মানুষ ৯৫ শতাংশ মানুষের সম্পদ শোষণ করছে। দুর্নীতি ক্যান্সারের মতো রাষ্ট্রের রক্তনালিতে ছড়িয়ে পড়েছে। রাষ্ট্র কার্যত একটি লুটপাটকারী অলিগার্কি গোষ্ঠীর হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে, যাদের পতন ছাড়া জাতীয় মুক্তি অসম্ভব।
২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রায় ২৩ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে, যার বর্তমান মূল্য প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা। প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা দেশ থেকে বেরিয়ে গেছে। গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি ও শ্বেতপত্র প্রতিবেদনে এই অর্থ পাচারকে অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর টিউমার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই বিপুল অর্থ পাচারের পেছনে দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ, ব্যাংক লুটেরা ব্যবসায়ী, আমলা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের একটি সংঘবদ্ধ অনৈতিক চক্র সক্রিয় ছিল। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে বাড়ি ও ব্যবসায় বিনিয়োগের মাধ্যমে এই অর্থ পাচার করা হয়েছে।
ব্যাংক খাত আজ দেশের সবচেয়ে বড় লুটপাটের ক্ষেত্র। খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি, যা দিয়ে একাধিক পদ্মা সেতু বা মেট্রোরেল নির্মাণ করা সম্ভব ছিল। শেয়ারবাজার থেকে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পের নামে ব্যয় করা অর্থের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত লুটপাট হয়েছে। এমনকি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার তহবিলও দুর্নীতির হাত থেকে রক্ষা পায়নি। এই অবাধ লুণ্ঠন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রায় অকার্যকর করে তুলেছে।
অথচ পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৬ শতাংশ এবং মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৭০০ ডলারের বেশি। প্রবাসী আয়, তৈরি পোশাক শিল্প, কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের শ্রমেই এই সম্পদ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এই সম্পদের সিংহভাগ জনগণের কাছে না পৌঁছে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় লুটপাট হয়েছে। উন্নয়নের সংখ্যাগত সাফল্যের আড়ালে ভয়াবহ বৈষম্য লুকিয়ে আছে।
ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে জাতির বড় প্রত্যাশা ছিল। মানুষ আশা করেছিল ব্যাংক লুটেরা ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। রাষ্ট্র সংস্কারের আলোচনা যতটা হয়েছে, রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্বের সংস্কার ততটা হয়নি। অথচ গণতান্ত্রিক সরকার ছাড়া বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
বাংলাদেশকে জাতীয় সম্পদ লুণ্ঠনের এই স্বর্গরাজ্য থেকে বের করে আনতে হলে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে, রাজনৈতিক দলগুলোকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে এবং দুর্নীতিবিরোধী কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ, ব্যাংক ও আর্থিক খাতে কঠোর জবাবদিহি, উন্নয়ন প্রকল্পে ডিজিটাল মনিটরিং ও স্বচ্ছতা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ এবং গণতান্ত্রিক ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের বিকল্প নেই।
জাতীয় সম্পদের বিকাশ বাংলাদেশের ভবিষ্যতের মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু এই সম্পদের অবাধ লুণ্ঠন চলতে থাকলে উন্নয়নের ভিত্তি ভেঙে পড়বে। দুর্নীতি একদিনে বন্ধ করা সম্ভব নয়, তবে পরিকল্পিত ও ধারাবাহিকভাবে বন্ধ করা সম্ভব। রাষ্ট্র, সরকার ও জনগণ একসঙ্গে কাজ করলে বাংলাদেশ একটি ন্যায়ভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক ও সর্বজনীন কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে।
এম এ আলীম সরকার, প্রাবন্ধিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সভাপতি, বাংলাদেশ গণমুক্তি পার্টি (বিজিপি)


















