হোম কেয়ার প্রতারণা: ধর্মের অপব্যবহার, রাষ্ট্রীয় সুবিধার লুটপাট এবং কমিউনিটির জন্য ভয়াবহ পরিণতি
হিমান রায়:
নিউইয়র্ক পোস্টসহ বিভিন্ন নিউইয়র্কভিত্তিক বাংলাদেশি গণমাধ্যমের সূত্রে সম্প্রতি আমাদের কমিউনিটির এক বেদনাদায়ক বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত হলাম। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিল্লাল হোসেন নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে যে হোম কেয়ার প্রতারণার তথ্য প্রকাশ পেয়েছে, তা শুধু আইন লঙ্ঘনের ঘটনা নয়—এটি নৈতিকতা, ধর্ম এবং প্রবাসী কমিউনিটির বিশ্বাসের ওপর সরাসরি আঘাত।
প্রথমেই পরিষ্কার করে বলা প্রয়োজন—আমেরিকায় হোম কেয়ার (Home Care) একটি মানবিক ও গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। বৃদ্ধ ও অসুস্থ বাবা-মাকে নিজ ঘরে থেকে দেখাশোনা করার জন্য সরকার পরিবার-সদস্যদের ঘন্টাভিত্তিক পারিশ্রমিক প্রদান করে। এই সুবিধার উদ্দেশ্য হলো—যাঁরা সত্যিকার অর্থে অসহায় ও নির্ভরশীল, তাঁদের সম্মানজনকভাবে সেবা নিশ্চিত করা।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এই মানবিক ব্যবস্থাকে ব্যক্তিগত লোভ চরিতার্থ করার হাতিয়ার বানিয়েছেন কিছু অসাধু ব্যক্তি। অভিযোগ অনুযায়ী, বিল্লাল হোসেন নিজেকে মায়ের কেয়ারগিভার হিসেবে দেখিয়ে সরকারি অর্থ গ্রহণ করছিলেন, অথচ তাঁর মা বাস্তবে বাংলাদেশে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করছিলেন।
আরও ভয়াবহ বিষয় হলো—এই প্রতারণাকে আড়াল করতে ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। নিয়মিত নার্স ভিজিটের সময় তিনি নিজের ছোট ভাইকে বোরখা পরিয়ে বিছানায় শুইয়ে রাখতেন এবং দাবি করতেন—তাঁর মা অত্যন্ত ধার্মিক ও পর্দাশীল; বাইরের কারও সামনে মুখ দেখান না। ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ায় সংশ্লিষ্ট নার্স জোর করতে পারেননি। এভাবেই দীর্ঘ সময় ধরে প্রতারণা চালিয়ে কয়েক লক্ষ মার্কিন ডলার আত্মসাৎ করা হয়।
এই অবৈধ অর্থের জোরে তিনি নিউইয়র্ক সিটির সবচেয়ে ব্যয়বহুল এলাকা ম্যানহাটনে বসবাস করতেন—যা এই প্রতারণার আর্থিক ব্যাপ্তি স্পষ্ট করে।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ইতোমধ্যেই ব্রুকলিনে এক বাংলাদেশি নারী ৬৮ মিলিয়ন ডলারের এল্ডারলি কেয়ার ফ্রডে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। অর্থাৎ, একটি ভয়াবহ প্রবণতা ধীরে ধীরে পুরো কমিউনিটিকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
এর সবচেয়ে করুণ পরিণতি হলো—এইসব প্রতারণার কারণে সরকার ভবিষ্যতে হোম কেয়ার ও এল্ডারলি কেয়ার সুবিধা কঠোরভাবে সীমিত বা বাতিল করার পথে হাঁটছে। ফলে যাঁদের সত্যিই এই সহায়তা প্রয়োজন—অসহায় বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী বা অসুস্থ মানুষ—তাঁরাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
এখন সময় এসেছে দায়িত্বশীল হওয়ার।
প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রত্যেকের উচিত , এ ধরনের প্রতারণা থেকে নিজে বিরত থাকা , আশপাশে এমন অনিয়ম দেখলে নীরব না থাকা , হোম কেয়ার বা এল্ডারলি কেয়ার ফ্রড দেখলে ৩১১ নম্বরে কল করে রিপোর্ট করা ।আইন ভাঙলে শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো কমিউনিটিই সন্দেহের মুখে পড়ে। মানবিক সুবিধাকে লুটপাটের অস্ত্র বানানো বন্ধ না করলে তার মাশুল আমাদের সবাইকেই দিতে হবে। সচেতনতা, নৈতিকতা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাই পারে এই সংকট থেকে আমাদের বের করে আনতে।
হিমান রায়, সমাজ কর্মী ও কলামিস্ট।


















