স্মরণে বরণে দেশনেত্রী খালেদা জিয়া—প্রদীপ কুন্ডু
প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক:
চলে গেলেন বেগম খালেদা জিয়া (১৯৪৫-২০২৫) , একটি বর্ষ বিদায়ের সাথে সাথে বাংলাদেশর রাজনীতির এক ব্যাক্তিত্বের মহকালের সমাপ্তি হল , দল হিসাবে বিএনপি’র আত্মপ্রকাশ ক্ষমতার রাজনীতির পিছন দরজা দিয়ে শহীদ প্রেসিডেন্টের হাত ধরে , কিন্ত ব্যাক্তি খালেদার বাংলাদেশের রাজনীতিতে অভিষেক হয়েছে ত্যাগ তিতিক্ষা আর রাজপথের লড়াকু সংগ্রামের পথ ধরে , একজন বিধবা মায়ের দুই সন্তানের সংসার , সদ্য প্রয়াত রাষ্ট্রপতি স্বামীর স্মৃতি বয়ে সংসার সামলানো ,বাংলাদেশের আর দশজন সাধারণ গৃহবধূর মতই ছিল তার সংসার , এরপর দলের জ্যেস্ঠ বিজ্ঞ নেতাদের অনুরোধে দলে এসে চেয়াপারসনের দ্বায়িত্ব নিয়ে দলকে সামলানো সেই সময়ের টালমাটাল রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে খুব সহজ কাজ ছিল না , কিন্তু তিনি সামলিয়েছেন, শুধু সামলিয়েছেন বললে কম বলা হবে একটি ভঙ্গুর দলকে নিয়ে রাজপথকে উত্তপ্ত রেখেছেন সামরিক শাসক এরশাদের বিরুদ্ধে , লাগাতার আন্দোলন করে গেছেন বাংলাদেশের শাসন পদ্ধতিতে গণতান্ত্রিক সুষ্ঠ নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যাবস্থা প্রবর্তণের কাঙ্খিত লক্ষ্যে । সেই সময়ে পঁচাত্তর পটপরিবর্তন কালে শেখ হাসিনাও বাংলাদেশের রাজনীতিতে সদ্য অভিসিক্তা , তাঁর দল আওয়ামীলীগ এবং তিনি নিজেও এই আন্দোলনে যুগপৎ ভুমিকায় অনন্য ছিলেন , এবং দেশ তখন হাসিনা খালেদাকে নিয়ে রাজনিতী মুখরতায় সরব ছিল ।
আশির দশকের শেষ ভাগ এবং নব্বই দশকের শুরুর প্রথম ভাগের পুরো অংশটাই জুড়ে আমরা তখন ছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্ছল তারুণ্যের প্রতিনিধি , আমাদের চোখের সামনেই নব্বইয়ের আন্দোলন , এরশাদের পতন , পুরো একটা সংগ্রামের সাক্ষী থেকে প্রত্যক্ষ করেছি দুই নেত্রীর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব , ভাত ও ভোটের আন্দোলনে সোচ্চার ছিল সারা দেশ যার অগ্রনী ভূমিকায় ছিলেন দুই নেত্রী ।
তবে এরশাদের অধীনে ছিয়াশীর নির্বাচনে আওয়ামীলীগের অংশগ্রহণ অনেকটাই স্বৈরাচারের সাথে আঁতাত করার সামিল ছিল , আর অন্যদিকে বিএনপি’র বিশেষ করে স্বল্প ভাষি খালেদার নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করা , তাকে করে তুলেছিল দৃঢ়চেতা এক আপোসহীন সংগ্রামী নেত্রীর চরিত্রে , এবং আমৃত্যু তিনি এই আপোসহীনতা তার রক্তের সাথে মিশে নিয়েছিলেন । বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া জীবনে দেখেছি বেগম খালেদা জিয়ার আপোসহীন সংগ্রামী চরিত্রের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু মেধাবী ছাত্র সমাজ সেই সময়ের রাজপথ কাঁপানো সংগ্রামী ছাত্রদলে একে একে যোগদান করে যা ছাত্রদলের ভীত আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং সারাদেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এর ব্যাপক প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে , ফলশ্রুতিতে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন এবং তৎপর স্বৈরাচার এরশাদ পতনে ছাত্রলীগের সাথে সাথে ছাত্রদলের ভূমিকাও ছিল অনস্বীকার্য ।
আজকের শোকাবহ দিনে হাসিনা খালেদার কোন প্রকার comparative আলোচনা বা মূল্যায়ন করার মানসিকতা মোটেই নাই , তবে প্রাসঙ্গিকতার খাতিরে কিছুটা এসে যায় , একানব্বইয়ের নির্বাচনে যেখানে আওয়ামীলীগের বিজয় হবে এমন ধারনাই অনেকের ছিল ,কিন্তু বিএনপি তথা খালেদার জিয়ার নির্বাচনী প্রচার কারিশমা ও কৌশলগত জোটের কারণে তদের জয় নিশ্চিত হয়ে যায় এবং বেগম জিয়া বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে শাসনভার পরিচালনা করেন । আর মোটামুটিভাবে বলা যায় ঐ নির্বাচনই নির্বাচনের ইতিহাসে অনেক ক্ষেত্রেই সুষ্ঠ নিরপেক্ষ নির্বাচন ছিল , তৎপরবর্তিতে নির্বাচনগুলো ধীরে ধীরে প্রশ্নবিদ্ধ হতে থাকে , অথচ ভাত ও ভোট এবং জনগনের অধিকার সংগ্রামে দুই নেত্রী সোচ্চার ছিলেন রাজপথে , জেল জলুমও কম সামলাতে হয়নি । বিশেষ করে হাসিনার শাসন আমলে নির্বাচন ব্যাবস্থাটা একেবারে নস্যাত হয়ে গিয়েছিল ।অথচ তার সুযোগ ছিল একটা সুন্দর নির্বাচনী ব্যাবস্থা করার কিন্তু তিনি তা না করে শাসন ক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রয়াসে যে সুরঙ্গ তৈরী করেন সেই সুরঙ্গ দিয়ে মৌলবাদের অবাধ বিচরণের প্রবেশ দ্বার উন্মোচন করে দিয়েছিলেন ,যার ভয়াবহ পরিনিতি তিনি স্বয়ং এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ । এ কথা বলব না যে খালেদার আমলে মৌলবাদ পোষন করা হয়নি , অবশ্যই যথেষ্ট করা হয়েছে , তবে আমাদের সময়ে -আশি নব্বই দশকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আজকের মত অবাধ মৌলবাদের বিচরণক্ষেত্র কখনোই আমাদের চোখের সামনে দৃশ্যমান ছিল না , যদিও সেই সময় বেগম জিয়ার শাসন কাল বিরাজ করছিল ,তবুও স্বাধীনতা , বঙ্গবন্ধু , মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বর্তমান বাংলাদেশের মত এত এত বীতশ্রদ্ধা , অসম্মান , আর একটি ভয়াবহ মুক্তিযুদ্ধ বিমুখ প্রজন্ম বাংলাদেশের জনগন সামনে প্রতিয়মান ছিল না । বেগম জিয়া অশ্যই একটি মুক্তিযোদ্ধা পরিবার থেকে আবির্ভূতা , কে জানে হয়ত এই দুর্বলতা থেকেই দেশের স্বাধীনতা আর মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তার সহজাত শ্রদ্ধা আর ভালবাসা ছিল অপরিসীম । কিন্তু জাতির দুর্ভাগ্য আজকের ধ্বংসোন্মুখ ৭১ বিমুখ একটি প্রজন্ম গঠনে হাসিনার ১৫ বছর শাসনকালের অসীম অদুরদর্শিতা ,স্বৈরাচারী ,প্রতিহিংসা পারায়ন শাসন ব্যাবস্থা দায়ী বললে কম বলা হবে না বরং এটাই সত্য ।
সেদিক থেকে খালেদার শাসন কাল মৌলবাদ- মোল্লাতন্ত্র মুক্ত ছিল না বটে তবে তারচেয়ে অধিক ঐনি তাদের use করেছেন । কারণ খালেদার কাছে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার বাসনাটা হয়ত ততধিক প্রাধান্য পায়নি । আর এইখানেই খালেদা স্বমহিমায় উদ্ভাসিত হয়েছেন -উদ্ভাসিত হয়েছে ওনার জাতিয় চেতনা বোধ , উদ্ভাসিত হয়েছে মাতৃত্বের মমত্ববোধ , উদ্ভাসিত ওনার দেশপ্রেম সর্বপরি ওনার ধর্ম গোত্র নির্বিশেষে একটি শান্তিময় সুখি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মানের কাঙ্খিত বাসনা । বেগম জিয়ার মৃদু হাসির আড়ালে ছিল একজন কঠোর রাজনীতিবিদের কঠোরতা । এইটুকু কঠোর না হলে তিনি হয়ত এত বড় একটি রাজনৈতিক দলে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারতেন না। তবে তাঁর কঠোরতার মধ্যে কোনো হিংস্রতা ও রুক্ষতা ছিল না , চিহ্নিত শাসকের কাছ থেকে পেয়েছিলেন অত্যচার নির্যাতন আর নিপিড়ণের কন্টক মালা তারপরেও তিনি তাদের প্রতি এতটুকু অভিযোগের আঙ্গুল ওঠাননি , এইখানে ঐনি হয়েছিলেন অসাধারণ ব্যাক্তিত্বের অধিকারিনী ।
সর্বজন শ্রদ্ধেয়া, মাননীয়া প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ওনার গভির উপলদ্ধি বোধ থেকে সর্বশেষ ভাষনে জাতির সামনে ধর্ম গোত্র অধিকার রক্ষা নির্বিশেষে , একটি শোষনহীন অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনের আদর্শের বাতাবরণ রেখে গেছেন । ওনার প্রতি লাখ লাখ , কোটি কোটি মানুষের শ্রদ্ধা আর পরম ভালবাসা সার্থক তখনই হবে যখন ওনার আদর্শে গড়া কাঙ্খিত বাংলাদেশের স্বাদ আম-জনতার ঘরে ঘরে পৌঁছাবে ।
পরিশেষে প্রয়াতা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর পুত্র জ্বনাব তারেক রহমান তাঁর মায়ের জন্যে ক্ষমা চেয়েছেন , সেই পরিপ্রেক্ষিতে আমি বলতে চাই ,চির বিদায়ী প্রধান মন্ত্রী ম্যাডাম খালেদ জিয়া , আপনি বরং আমাদেরকে ক্ষমা করবেন , কারণ আমরা দুর্ভাগা জাতি , আমরা সময় থাকতে যোগ্য ব্যাক্তিদের সঠিকভাবে সম্মান ও মর্যাদা দিতে পারি না । আমাদের সীমাবদ্ধতাকে ক্ষমা করবেন এবং উপর থেকে আশির্বাদ ও দোয়া করবেন যেন হিংসা বিদ্বেষ উপেক্ষা করে ৭১ এর চেতনা উর্দ্ধে রেখে বাংলাদেশ বিনির্মানে আমাদের সকল নেতাদের যেন শুভ বুদ্ধির উদয় হয় ।
খালেদা জিয়া অমর হোক ॥
কলামিস্ট প্রদীপ কুন্ডু ।

















