Logo

আন্তর্জাতিক    >>   নিউইয়র্কে গার্ড অব অনার ও ২০ হাজার মানুষের শ্রদ্ধায় বাংলাদেশি পুলিশ অফিসার দিদারুল ইসলামকে চিরবিদায়

নিউইয়র্কে গার্ড অব অনার ও ২০ হাজার মানুষের শ্রদ্ধায় বাংলাদেশি পুলিশ অফিসার দিদারুল ইসলামকে চিরবিদায়

নিউইয়র্কে গার্ড অব অনার ও ২০ হাজার মানুষের শ্রদ্ধায় বাংলাদেশি পুলিশ অফিসার দিদারুল ইসলামকে চিরবিদায়

প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক, নিউইয়র্ক, আমেরিকা:

যুক্তরাষ্ট্রে কর্তব্যরত অবস্থায় বন্দুকধারীর হামলায় নিহত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত পুলিশ অফিসার দিদারুল ইসলামকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়েছে। স্থানীয় সময় ৩১ জুলাই বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসের পার্কচেস্টার জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত তাঁর জানাজায় অংশ নেন প্রায় ২০ হাজার মানুষ। অশ্রু, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও ফুলে ফুলে সজ্জিত এই বীর সন্তানকে বিদায় জানান সকল শ্রেণিপেশার মানুষ।

ঝড়-বৃষ্টি ও বন্যার সতর্কতা উপেক্ষা করে সকাল থেকে ব্রঙ্কসের ভার্জিনিয়া অ্যাভিনিউতে মানুষের ঢল নামে। শুধু নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের সদস্যই উপস্থিত ছিলেন প্রায় ৫ হাজার। এছাড়া বিভিন্ন সংস্থা ও রাজ্য থেকে আগত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও অংশ নেন জানাজায়। উপস্থিত ছিলেন নিউইয়র্ক স্টেটের গভর্নর ক্যাথি হকুল, নিউইয়র্ক সিটি মেয়র এরিক অ্যাডামস, পুলিশ কমিশনার জেসিকা টিশ, কংগ্রেসম্যান রিচি টরেস, পাবলিক অ্যাডভোকেট জুমানে উইলিয়ামসসহ নানা প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।

জানাজার নামাজ পড়ান পার্কচেস্টার জামে মসজিদের খতিব ডা. জাকির আহমেদ। তাঁদের বক্তব্যে বারবার উচ্চারিত হয়েছে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশি কমিউনিটির গৌরবের কথা।

জানাজার পর হাজার হাজার পুলিশ সদস্য রাস্তার দুই ধারে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে দিদারুল ইসলামকে শেষবারের মতো স্যালুট জানান। আকাশপথে হেলিকপ্টার থেকে দেওয়া হয় গার্ড অব অনার। এরপর দিদারুলের মরদেহ নেওয়া হয় নিউ জার্সির লোরেল গ্রোভ কবরস্থানে, সেখানে তাঁকে দাফন করা হয় পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায়।

নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগ জানায়, দিদারুল ইসলামকে মরনোত্তর ‘ডিটেকটিভ ফার্স্ট গ্রেড’ পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এটি বিভাগের সর্বোচ্চ মর্যাদার এক পদ, যা সাধারণত দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞ পুলিশ সদস্যদের দেওয়া হয়। এই পদে পদোন্নতির ফলে তাঁর পরিবার সর্বোচ্চ পেনশন ও অন্যান্য সুবিধা পাবে।

নিহত দিদারুল ইসলাম চার বছর আগে পুলিশ বিভাগে যোগ দেন। এর আগে তিনি স্কুল সেইফটি বিভাগ এবং ট্রাফিক ইউনিটে কাজ করেছেন। তাঁর দেশের বাড়ি সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলায়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৩৬ বছর। তিনি দুই পুত্র সন্তানের জনক এবং স্ত্রী বর্তমানে আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গেল ২৮ জুলাই সোমবার বিকেলে নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের পার্ক অ্যাভিনিউয়ের একটি অফিস ভবনে দায়িত্ব পালনকালে এক বন্দুকধারীর হামলায় দিদারুল ইসলামসহ মোট চারজন নিহত হন। হামলাকারী ২৭ বছর বয়সী শ্যেন ডেভন তামুরা পরে আত্মহত্যা করে। ‘গান ভায়োলেন্স আর্কাইভ’-এর তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে ২৫০টির বেশি বন্দুক হামলায় বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে।

এই বিয়োগান্ত ঘটনাটি নিউইয়র্কজুড়ে শোকের ছায়া ফেলে। কবি ও বাচিক শিল্পী ছন্দা সুলতানা এক আবেগঘন মন্তব্যে বলেন, জানাজার দিন আকাশ অঝোর ধারায় কেঁদেছিল, ঠিক যেন প্রকৃতিও এক বাঙালির এই গৌরবময় মৃত্যুকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছিল। তাঁর ভাষায়, “এই মৃত্যু যেমন বিষাদের, তেমনি একজন বাঙালি হিসেবে গর্বেরও।”

দিদারুল ইসলামের মৃত্যু শুধু একজন পুলিশ অফিসারের মৃত্যু নয়, এটি এক স্বামী, এক পিতা, এক সন্তানের হারানোর বেদনা। ছোট সন্তানের কণ্ঠে এখন শুধু একটাই প্রশ্ন—“বাবা কোথায়?” এই প্রশ্নে ভারাক্রান্ত শুধু তাঁর পরিবার নয়, সমগ্র কমিউনিটি।

নিউইয়র্কের ইতিহাসে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কোনো পুলিশ কর্মকর্তার এমন সম্মানজনক বিদায়ের নজির নেই। বীর সন্তান দিদারুল ইসলামের আত্মত্যাগকে শ্রদ্ধা জানিয়ে নিউইয়র্কজুড়ে আলোচিত হয়েছে বাংলাদেশের নাম।

এই বীরের মৃত্যু হিমালয়ের চেয়েও ভারী, আবার শিউলি ফুলের মতো পবিত্র। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এসে নিউইয়র্ক যেন একদিনের জন্য থমকে দাঁড়িয়েছিল। এই শহর তাঁকে মনে রাখবে চিরদিন।

ভিডিও দেখুন:-