Logo

আন্তর্জাতিক    >>   সিরাজুল আলম খান: বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রচিন্তার এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়

সিরাজুল আলম খান: বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রচিন্তার এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়

সিরাজুল আলম খান: বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রচিন্তার এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়

প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক:

গত ২২ জুন ২০২৫, রোববার সন্ধ্যায় নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসের জুইস সেন্টারে অনুষ্ঠিত হলো বাংলাদেশ স্বাধীনতার অন্যতম রূপকার, নিউক্লিয়াস ও বিএলএফ (বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স)-এর প্রতিষ্ঠাতা, রাষ্ট্রচিন্তাবিদ সিরাজুল আলম খানের দ্বিতীয় প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে এক স্মরণসভা।

সভায় সভাপতিত্ব করেন সিরাজুল আলম খান স্মৃতি পরিষদ নিউইয়র্ক-এর আহ্বায়ক ডা. মুজিবুল হক এবং সঞ্চালনায় ছিলেন সংগঠনের সদস্যসচিব শাহাব উদ্দীন। অনুষ্ঠানের শুরুতেই মরহুমের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

সভায় বক্তব্য রাখেন ,অ্যাডভোকেট মুজিবুর রহমান, মুক্তিযোদ্ধা সুব্রত বিশ্বাস, লিগ্যাল কনসালটেন্ট মুজিবুর রহমান, বাংলাদেশ পত্রিকার সম্পাদক ডা. ওয়াজেদ এ খান, প্রাক্তন গণকণ্ঠ সাংবাদিক আনোয়ার খন্দকার, মোজাহিদ আনসারি, হাজি আনোয়ার হোসেন লিটন, জাকির হোসেন বাচ্চু, জামান তপন, নূরে আলম জিকু, নজরুল ইসলাম, আবুল হোসেন, আব্দুর রহিমসহ একাধিক বিশিষ্ট বক্তা।

সিরাজুল আলম খান ছিলেন একাধারে এক অসাধারণ চিন্তাশীল রাজনীতিক, দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক এবং আত্মত্যাগী দেশপ্রেমিক। সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া এই মহান নেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতে অনার্স সম্পন্ন করলেও ‘কনভেনশনাল মুভমেন্ট’-এ যুক্ত থাকায় কারাবরণ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হন, যার ফলে মাস্টার্স শেষ করা সম্ভব হয়নি।

তবে পড়াশোনা, গবেষণা এবং রাষ্ট্রচিন্তার মাধ্যমে তিনি নিজেকে গড়ে তোলেন এক আন্তর্জাতিক মানের চিন্তাবিদ হিসেবে। বিভিন্ন সময়ে বিশ্বের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন তিনি।

১৯৬৩ সালে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই শুরু হয় তাঁর পর্দার আড়ালের কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংগঠক হিসেবে ভূমিকা। ১৯৬৩ সালেই আব্দুর রাজ্জাক ও কাজী আরেফ আহমেদকে নিয়ে গঠন করেন ‘নিউক্লিয়াস’। এই গোপন সংগঠনের হাত ধরেই ৬-দফা, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও ১৯৭১ সালের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের রূপরেখা গড়ে ওঠে।

বক্তারা বলেন, সিরাজুল আলম খানের চিন্তাধারা ও প্রস্তাবিত রাষ্ট্র কাঠামো যদি স্বাধীনতার পরপরই কার্যকর হতো, তবে আজকের বাংলাদেশ হতে পারত সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ার মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্র। দুর্ভাগ্যবশত, তার বিপ্লবী চিন্তা ও প্রস্তাবনাগুলোকে উপেক্ষা করা হয় এবং তার অনুসারীরা পরবর্তীতে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হন।

১৯৯০ দশকের শুরুতেই তিনি একটি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার খসড়া প্রণয়ন করেন—যেখানে ছিল দুই কক্ষ বিশিষ্ট সংসদ, রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, কালাকানুন বাতিল, ৭০ ধারা সংস্কার, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, স্থায়ী জুডিশিয়াল কাউন্সিল, ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণ ও গরিবদের জন্য মাইক্রো-ক্রেডিট প্রবর্তনের মতো অগ্রগামী চিন্তা।

সভায় উল্লেখ করা হয়,তিনি জীবনে কখনো ভোগের রাজনীতি করেননি, বরং ছিলেন আত্মত্যাগ ও আদর্শিক সংগ্রামের প্রতীক। মৃত্যুর আগে নিজের অছিয়তে লিখে গেছেন—

“কোনো শোকসভা নয়, পুষ্পমাল্য নয়, গার্ড অব অনার নয়, শুধু মা’র একটি সাদা শাড়ি দিয়ে মোড়ানো লাশটা যেন গ্রামে বাবা-মার কবরের পাশে পুঁতে দেওয়া হয়।” — এবং সেইভাবেই তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

সিরাজুল আলম খানের মত ব্যক্তিত্বের জীবন ও দর্শনকে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। যাতে আগামী প্রজন্ম এক খাঁটি দেশপ্রেমিক রাষ্ট্রনায়ককে জানার ও অনুসরণ করার সুযোগ পায়। সভা শেষে সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।