নিউইয়র্কে চাঁদাবাজির বাড়-বাড়ন্তে ক্ষুব্ধ বাঙালি ব্যবসায়ীরা: শিল্পী রানো নেওয়াজের পোস্ট ঘিরে বিতর্ক
প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক, নিউইয়র্ক, জুন ২০২৫:
নিউইয়র্কে বাঙালি কমিউনিটিতে চাঁদাবাজির প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। বিশেষ করে পিকনিক, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও নানা দিবসকেন্দ্রিক আয়োজনে চাঁদা তোলার প্রবণতা অতীতের সব মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে বলে অভিযোগ উঠছে। এতে করে ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন পেশাজীবী বাঙালিরা চরম বিরক্তি ও বিপাকে পড়েছেন। অনেকের কাছেই এটি এখন “অসহনীয় সামাজিক চাপ” হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে নিউইয়র্কের সুপরিচিত কণ্ঠশিল্পী ও সাপ্তাহিক ‘আজকাল’ পত্রিকার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক রানো নেওয়াজ সম্প্রতি তার ভেরিফায়েড ফেসবুক প্রোফাইলে একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাস দেন। তিনি চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেন এবং জানান, এই পরিস্থিতি তার পারিবারিক ও পেশাগত জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
রানো নেওয়াজ লেখেন,“অফিসে ঢোকার আগেই ৭/৮ জন ঢুকে পড়ে চাঁদা চাওয়ার জন্য। বিভিন্ন প্রোগ্রামের দাওয়াত দিয়ে জোর করে চাঁদা তোলার চেষ্টায় আমাদের জীবন অতিষ্ঠ। পকেটে টাকা না থাকলে প্রেসিডেন্ট/সেক্রেটারি হওয়ার দরকার কী? ব্যবসা করে যাদের সংসার চলে, তাদের এভাবে চাপ দিয়ে টিকিয়ে রাখা যায় না।”
তার এই পোস্টে কমিউনিটির অনেক সদস্য একমত হয়ে মন্তব্য করলেও, কিছুজন এর বিরুদ্ধেও বক্তব্য রাখেন।
জাকারিয়া চৌধুরী মন্তব্য করেন, “ভাবী অনেক দেরিতে বুঝলেন। এদের অত্যাচারে অনেকেই কমিউনিটি থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন।”
আতাউল এইচ আহাদ বলেন, “মেধা, পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে আজকের এই অবস্থানে পৌঁছেছেন রানু-শাহনেওয়াজ দম্পতি। এভাবে নির্লজ্জভাবে হাত পাতা কাম্য নয়।”
অপরদিকে, এইচ এম ইসরাফিল রানো নেওয়াজের বক্তব্যকে অতিরঞ্জিত ও কমিউনিটি নেতাদের প্রতি অবমাননাকর বলে আখ্যা দেন। তিনি পাল্টা প্রশ্ন তোলেন— “আপনারাও তো চাঁদা দিয়ে এই ‘ব্যাড কালচার’-এর অংশ হয়েছেন। দায় এড়ানো যায় কি?”
একজন পরিচিত সংগঠক নাম প্রকাশ না করে বলেন, “যে প্রোগ্রাম পরিচালনার সামর্থ্য নেই, সেটা না করাই উত্তম। তবে যারা অনুদান দেন, তাদেরও প্রাপ্তি থাকে— তারা অতিথি হন, গ্রান্ড মার্শাল হন। সমাজে কিছু দেওয়া ও নেওয়ার মাধ্যমেই সম্পর্ক গড়ে উঠে।”
রাজনৈতিক সংগঠনের এক নেতা বলেন, “নিউইয়র্কে কেউ কাউকে জোর করে চাঁদা দিতে বাধ্য করতে পারে না। এখানকার অনেক সফল ব্যক্তি নিজের ইচ্ছায় অনুদান দেন, এবং বিনিময়ে সামাজিক স্বীকৃতিও পান। রানু-শাহনেওয়াজরাও সেটা ভালো করেই জানেন।”
চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে এ ধরনের খোলামেলা পোস্ট বিরল হলেও, এটি কমিউনিটির ভেতরে বহুদিনের চাপা ক্ষোভকে সামনে নিয়ে এসেছে বলে মনে করছেন অনেকে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে চাঁদা সংস্কৃতি, কমিউনিটি সংগঠন পরিচালনা ও দাতাদের ভূমিকাকে নিয়ে নিউইয়র্কের বাঙালি সমাজে একটি নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে।
নিউইয়র্কের প্রবাসী বাঙালি সমাজে চাঁদা ও অনুদানের সংস্কৃতি বহুদিনের। অনেকে মনে করেন, এটি সমাজের উন্নয়ন ও সংগঠনের কর্মকাণ্ড চালনার জন্য অপরিহার্য। আবার অনেকে এটিকে বাণিজ্যিকীকরণ ও সামাজিক চাপ প্রয়োগের এক রূপ বলে মনে করেন।
রানো নেওয়াজের মত প্রকাশ নিঃসন্দেহে সাহসিকতাপূর্ণ এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার নিরিখে উপস্থাপিত। তার এই স্ট্যাটাস বহু মানুষের মনের কথা হয়ে উঠেছে, যারা মুখ খুলতে ভয় পান কিংবা সামাজিক চাপের ভয়ে চুপ থাকেন। তবে তার ভাষা ও উপস্থাপন ভিন্নভাবে করা যেত, যাতে কমিউনিটির সম্মান ও সমালোচনার ভারসাম্য বজায় থাকে।
অপরদিকে, যারা এ ধরনের অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন, তাদেরও বক্তব্যের জায়গা রয়েছে। সব অনুষ্ঠানের আয়োজকই যে স্বার্থান্বেষী— তা বলা যায় না। অনেকে নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা নিয়েই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজন করেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়— এই আয়োজনগুলো যদি প্রাতিষ্ঠানিক, স্বাবলম্বী এবং পরিকল্পিত না হয়, তবে কি তা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে?
এখন সময় এসেছে, নিউইয়র্কসহ প্রবাসে বাঙালি কমিউনিটিতে একটি নীতিগত ও স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার। দাতা-গ্রহীতার মধ্যে পারস্পরিক সম্মান ও দায়িত্ববোধ ছাড়া এই সংস্কৃতি টেকসই হতে পারে না।
চাঁদা নয়, প্রয়োজন দায়িত্বশীল নেতৃত্ব ও নৈতিকতা। পকেটভিত্তিক নয়, হোক মূল্যবোধভিত্তিক সংগঠন। তা না হলে, শুধু শিল্পী রানো নেওয়াজ নয়— আরও অনেকেই হয়তো একই ক্ষোভ নিয়ে সমাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন। তখন শুধু একটি পোস্ট নয়, ভাঙনের সুর বাজবে গোটা কমিউনিটিতেই। সূত্র:- সন্ধান ২৪ প্রতিবেদন



















