ভিসার নিয়মে বড় পরিবর্তন আনল ভারত: হঠাৎ এই বড় পরিবর্তনের কারন কী?
প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক:
ভারতে দীর্ঘমেয়াদে অবস্থান করতে ইচ্ছুক বিদেশি নাগরিকদের জন্য ভিসা ও নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন) সংক্রান্ত নিয়মে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। নতুন বিধান অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিক যদি ভারতে ১৮০ দিনের বেশি অবস্থান করতে চান, তবে তাকে ১৮০ দিনের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। আগে ১৮০ দিন পূর্ণ হওয়ার পর অতিরিক্ত ১৪ দিনের মধ্যে নিবন্ধনের সুযোগ থাকলেও নতুন সংশোধনীতে সেই ‘গ্রেস পিরিয়ড’ বাতিল করা হয়েছে।
ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্প্রতি ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স রুলস, ২০২৫’-এর ১২ নম্বর ধারা সংশোধন করে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। সংশোধিত নিয়ম ইতোমধ্যে কার্যকর হয়েছে বলে জানা গেছে।
কী পরিবর্তন হলো?
আগের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিক ভারতে একটানা ১৮০ দিন অবস্থানের পর পরবর্তী ১৪ দিনের মধ্যে নিবন্ধন করতে পারতেন। কিন্তু নতুন নিয়মে বলা হয়েছে, ১৮০ দিনের বেশি থাকতে চাইলে সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে।
এছাড়া যেসব বিদেশির ভিসার মেয়াদ ১৮০ দিনের বেশি, কিন্তু ভিসার শর্ত অনুযায়ী একটানা ১৮০ দিনের বেশি অবস্থান করা যায় না, তাদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ, অবস্থানকাল বাড়ানোর প্রয়োজন হলে ১৮০ দিনের সীমা অতিক্রম করার আগেই নিবন্ধন করতে হবে।
ভারত সরকার স্পষ্ট করেছে, নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর নিবন্ধনের আবেদন এখন থেকে শুধুমাত্র অত্যন্ত জরুরি বা আপৎকালীন পরিস্থিতিতে বিবেচনা করা হবে।
কেন এই কড়াকড়ি?
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশি নাগরিকদের ওপর নজরদারি জোরদার, ভিসা ব্যবস্থার অপব্যবহার রোধ এবং ইমিগ্রেশন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতেই এই পরিবর্তন আনা হয়েছে।
ভারতীয় কর্তৃপক্ষের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অনেক বিদেশি নাগরিক পর্যটন বা চিকিৎসা ভিসায় দেশটিতে প্রবেশ করে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি দিন অবস্থান করেন। নতুন বিধানের মাধ্যমে এমন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, অবৈধভাবে অবস্থানকারীদের দ্রুত শনাক্তকরণ এবং সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা জোরদার করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশিদের ওপর কী প্রভাব পড়বে?
বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক মানুষ চিকিৎসা, ব্যবসা, শিক্ষা ও পারিবারিক কারণে ভারতে যান। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা গ্রহণকারী বা নিয়মিত ভারতে অবস্থানকারী বিদেশি নাগরিকদের জন্য নতুন বিধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন থেকে বিদেশিদের ভিসার মেয়াদ ও অবস্থানের দিনসংখ্যা আরও সতর্কতার সঙ্গে হিসাব রাখতে হবে। নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রম করলে ভবিষ্যতে ভিসা নবায়ন বা নতুন ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হতে পারে।
ডিজিটাল হচ্ছে পুরো প্রক্রিয়া
নিয়ম কঠোর করার পাশাপাশি ইমিগ্রেশন ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও দ্রুততর করতে ডিজিটাল সেবার পরিধি বাড়িয়েছে ভারত সরকার।
নতুন ব্যবস্থায় কোনো বিদেশি নাগরিক ভিসা বা অবস্থানসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হলে সরাসরি ব্যুরো অব ইমিগ্রেশনের গভর্নরের কাছে অনলাইনে আপিল করতে পারবেন। আগে এসব আপিল নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় লাগলেও এখন সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।
বিদেশি দম্পতির সন্তানদের জন্য স্বস্তি
একদিকে ভিসা ও নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় কড়াকড়ি বাড়ানো হলেও অন্যদিকে ভারতে জন্ম নেওয়া কিছু শিশুর ক্ষেত্রে নিয়ম শিথিল করা হয়েছে।
নতুন বিধান অনুযায়ী, বিদেশি দম্পতির ঘরে জন্ম নেওয়া কোনো শিশুর বাবা বা মা যদি ভারতীয় নাগরিক হন এবং শিশুটি ভারতীয় নাগরিকত্ব বজায় রাখে, তাহলে তার জন্য আলাদা জন্ম-রিপোর্টিং বা নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা থাকবে না। তবে পরবর্তীতে শিশুটি অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করলে নাগরিকত্ব পরিবর্তনের ৩০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তা জানাতে হবে।
হাসপাতালগুলোর জন্য নতুন নির্দেশনা
নতুন প্রজ্ঞাপনে হাসপাতাল, নার্সিং হোম ও চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর জন্যও কিছু প্রশাসনিক নির্দেশনা হালনাগাদ করা হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠানে বিদেশি রোগীদের থাকার বা রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা রয়েছে, তাদের নির্ধারিত তথ্য ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষকে সরবরাহ করতে হবে। তবে তথ্য জমা দেওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও সমন্বিত ও ডিজিটাল করা হয়েছে।
যা জানা জরুরি
১/ ১৮০ দিনের বেশি থাকতে চাইলে আগেই নিবন্ধন করতে হবে।
২/ আগের ১৪ দিনের অতিরিক্ত সময় (গ্রেস পিরিয়ড) বাতিল করা হয়েছে।
৩/ দীর্ঘমেয়াদি ভিসাধারীদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।
৪/ দেরিতে নিবন্ধন এখন শুধুমাত্র জরুরি পরিস্থিতিতে বিবেচিত হবে।
৫/ অনলাইন আপিলের সুযোগ রাখা হয়েছে এবং নিষ্পত্তির সময়সীমা সর্বোচ্চ ৬০ দিন।
৬/ বিদেশি দম্পতির সন্তানদের নাগরিকত্বসংক্রান্ত কিছু নিয়ম সহজ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স রুলস, ২০২৫’-এ এই সংশোধন ভারতের অভিবাসন ব্যবস্থাকে আরও কঠোর, ডিজিটাল ও নজরদারিনির্ভর করার একটি বড় পদক্ষেপ। ফলে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ভারতে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদি দর্শনার্থী, রোগী ও পেশাজীবীদের এখন থেকে ভিসার শর্ত ও অবস্থানের সময়সীমা সম্পর্কে আরও সচেতন থাকতে হবে। সূত্র: গালফ নিউজ, গালফ নিউজ, জাগোনিউজ



















