Logo

আন্তর্জাতিক    >>   সরকার বদলায়, দুর্নীতি বদলায় না

সরকার বদলায়, দুর্নীতি বদলায় না

সরকার বদলায়, দুর্নীতি বদলায় না

এম এ আলীম সরকার:

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ স্বনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার প্রত্যাশা নিয়ে এগিয়ে চলেছে। দেশের উদ্যোক্তা, কৃষক, শ্রমিক এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তারা উৎপাদনমুখী অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করার নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অথচ অন্যদিকে দুর্নীতি, অর্থপাচার, ব্যাংক লুটপাট, অদক্ষ নীতি প্রণয়ন এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় জাতীয় সম্পদের অপচয় অব্যাহত রয়েছে। উৎপাদনশীল অর্থনীতি ও সম্পদ লুণ্ঠনের এই দ্বৈত প্রবণতার অবসান ঘটানোই আজ বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন ভারতীয় উপমহাদেশের হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে। ব্রিটিশরা ভারতে আসার আগে মোগল সাম্রাজ্য ছিল বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ সাম্রাজ্য এবং বাংলা ছিল তার সমৃদ্ধতম প্রদেশগুলোর একটি। ঔপনিবেশিক শোষণ, অর্থনৈতিক লুণ্ঠন ও প্রশাসনিক বৈষম্যের ফলে বাংলার অর্থনীতি গভীর সংকটে নিমজ্জিত হয়। ব্রিটিশদের Divide and Rule নীতি উপমহাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভাজনকে আরও তীব্র করে তোলে।

১৯১৬ সালের লখনৌ চুক্তির মাধ্যমে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা হয়েছিল। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ সে সময় হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের দূত হিসেবে প্রশংসিত হন। কিন্তু পরবর্তীকালে রাজনৈতিক সমঝোতার ভাঙন, সাম্প্রদায়িক বিভাজন এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব উপমহাদেশের বিভক্তির পথকে সুগম করে।

ইতিহাসবিদ উইলিয়াম হান্টার ১৮৭১ সালে বাংলার মুসলমানদের অর্থনৈতিক দুরবস্থার যে চিত্র তুলে ধরেছিলেন, তা তৎকালীন সামাজিক বৈষম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। মুসলমানদের শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ার বাস্তবতা পাকিস্তান আন্দোলনের অন্যতম ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দ্বিজাতি তত্ত্বের উত্থান এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলন আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অর্জনের রাজনৈতিক সংগ্রাম হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। পরবর্তীকালে বাংলাদেশের জন্মও ছিল একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা, যার মূল ভিত্তি ছিল বাঙালির জাতীয় অধিকার, রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।

কিন্তু স্বাধীনতার পর অর্থনৈতিক মুক্তির সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। পাকিস্তান আমলের মতো স্বাধীন বাংলাদেশেও ক্ষমতা, সম্পদ ও অর্থনীতির ওপর একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত ধনী অলিগার্ক শ্রেণি, যারা রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহুবার ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটেছে। এসেছে নতুন দল, নতুন নেতৃত্ব, নতুন রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি। গণতান্ত্রিক সরকার, সামরিক শাসন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, ওয়ান-ইলেভেন সরকার এবং অন্তর্বর্তী সরকার—বিভিন্ন ধরনের শাসনব্যবস্থা দেশ পরিচালনা করেছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের সর্বজনীন কল্যাণ, অর্থনৈতিক অধিকার এবং দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি।

১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনসহ পরবর্তী বহু নির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থার সংকট ক্রমাগত গভীর হয়েছে।

দীর্ঘদিনের শাসনব্যবস্থা, ভোটাধিকার সংকোচন, রাজনৈতিক একগুঁয়েমি এবং জনগণের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে আন্দোলন ও দমন-পীড়নের ঘটনায় বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানির কথা উঠে এসেছে। রক্তক্ষয়ী এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার, দুর্নীতির অবসান এবং লুণ্ঠিত জাতীয় সম্পদ পুনরুদ্ধার।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, জনগণ সেই প্রত্যাশার কতটুকু বাস্তবায়ন দেখতে পেয়েছে?

সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন ধারণা ও অভিযোগ রয়েছে যে, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে সংঘটিত দুর্নীতি ও লুটপাটের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও দুর্নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থেকেছে। ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটলেও দুর্নীতির কাঠামোগত পরিবর্তন হয়নি। বরং দুর্নীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর পরিচয় বদলেছে, কিন্তু দুর্নীতির সংস্কৃতি রয়ে গেছে।

এ কারণেই আজ সাধারণ মানুষের মুখে মুখে একটি প্রশ্ন ঘুরে বেড়াচ্ছে—সরকার বদলায়, দুর্নীতি বদলায় না কেন?

দুর্নীতি বলতে ক্ষমতা বা দায়িত্বের অপব্যবহারের মাধ্যমে ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনকে বোঝায়। ঘুষ, স্বজনপ্রীতি, অর্থপাচার, সরকারি সম্পদের অপব্যবহার, নিয়োগ-বাণিজ্য, ব্যাংক লুটপাট এবং প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে দেখানো দুর্নীতির বিভিন্ন রূপ।

দুর্নীতির বিস্তারের প্রধান কারণ হলো জবাবদিহিতার দুর্বলতা, আইনের অসম প্রয়োগ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতার অভাব এবং রাজনৈতিক প্রভাব। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ও প্রশাসনের মধ্যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে না উঠলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ে।

স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের জীবনমানের প্রত্যাশিত উন্নয়ন হয়নি। বরং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও আমলাদের একটি অংশের সম্পদ ও ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

দেশের অর্থনৈতিক সম্পদের একটি বড় অংশ অল্পসংখ্যক মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এই বৈষম্য শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়, এটি সামাজিক ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্রের জন্যও গভীর হুমকি।

দুর্নীতি আজ রাষ্ট্রের রক্তপ্রবাহে ছড়িয়ে পড়া এক ভয়াবহ ব্যাধির মতো। এর প্রতিকার না হলে অর্থনীতি, প্রশাসন ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়বে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় সংকট হলো বিদেশে অর্থপাচার। বিভিন্ন গবেষণা ও অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচারের তথ্য উঠে এসেছে। ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হওয়ার যে হিসাব বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তা দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার গভীর দুর্বলতার ইঙ্গিত বহন করে।

অর্থপাচারের সঙ্গে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, আর্থিক খাতের প্রভাবশালী ব্যক্তি, আমলা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের একটি অনৈতিক চক্র জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

ঘুষ, আর্থিক অপরাধ, বাণিজ্যে মিথ্যা ঘোষণা, ব্যাংক থেকে অর্থ আত্মসাৎ, খেলাপি ঋণ, রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি, শেয়ারবাজার কারসাজি এবং কর ফাঁকির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর প্রকাশিত শ্বেতপত্রে অর্থপাচারকে অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর টিউমার হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থাপনা, সরকারি ব্যয়, বৈদেশিক বাণিজ্য, রপ্তানি, আমদানি, প্রবাসী আয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সরকারি প্রকল্পের ব্যয়—বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে।

যারা অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ বিদেশে পাচার করে, তারা শুধু অর্থনীতির ক্ষতি করে না; তারা দেশের জনগণের অধিকার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্ভাবনাকেও ধ্বংস করে।

ব্যাংক খাতে দুর্নীতি ও লুটপাট বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করেছে। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যাংক দখল, ঋণ জালিয়াতি, অনিয়মিত ঋণ বিতরণ এবং ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠী ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে।

দেশের ব্যাংক খাতে বিপুল পরিমাণ দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ সৃষ্টি হয়েছে। এই অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহৃত হলে বহু গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণ, কৃষি উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব হতো।

সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, ব্যাংক লুটপাটের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ও দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। জনগণের অর্থ আত্মসাৎকারীদের বিচারের আওতায় আনা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।

বাংলাদেশের শেয়ারবাজার দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, কারসাজি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটে ভুগছে। প্রতারণা, প্লেসমেন্ট শেয়ার, আইপিও জালিয়াতি এবং বাজার কারসাজির মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।

ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা তাদের সঞ্চয় হারিয়েছেন। বাজারের মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক সংকটে পড়েছে। অথচ দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

একইভাবে উন্নয়ন প্রকল্পের নামে ব্যয় বৃদ্ধি, রাজনৈতিক চাঁদাবাজি, ঘুষ এবং অস্বচ্ছ দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জাতীয় সম্পদের অপচয়ের অভিযোগ রয়েছে।

গত ১৫ বছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। কিন্তু উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকৃত ব্যয়, জনগণের প্রাপ্ত সুবিধা এবং অর্থের সঠিক ব্যবহার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।

উন্নয়ন মানে শুধু বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ নয়। উন্নয়ন মানে মানুষের জীবনমানের উন্নতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা।

যে উন্নয়নের নামে জনগণের অর্থ লুণ্ঠিত হয়, সেই উন্নয়ন প্রকৃত অর্থে জনকল্যাণমূলক হতে পারে না।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন সময়ের প্রকাশিত পরিসংখ্যানে খেলাপি ঋণের বিপুল অঙ্কের তথ্য উঠে এসেছে।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক কম। পরবর্তী সময়ে তা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর গভীর চাপ সৃষ্টি করেছে।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও খেলাপি ঋণের সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া যায়নি। বরং নতুন করে ঋণখেলাপি হওয়ার প্রবণতা অর্থনীতির জন্য উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।

ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করে তা উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার না করা, ঋণ পরিশোধ না করা এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল করার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে।

ব্যাংকিং খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে। ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা, ঋণগ্রহীতার সক্ষমতা যাচাই এবং ঋণ আদায়ে কঠোর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। রাষ্ট্র সংস্কারের পাশাপাশি ব্যাংক লুটপাটকারী, দুর্নীতিবাজ এবং অর্থপাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে—এমন প্রত্যাশা ছিল সাধারণ মানুষের।

বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও শিল্পোদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উৎপাদনশীল অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা হবে।

কিন্তু এসব ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জিত হয়েছে কি না, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে।

রাষ্ট্র সংস্কার অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু রাষ্ট্র সংস্কারের নামে দীর্ঘ সময় ব্যয় করে অর্থনৈতিক সংকট, দুর্নীতি ও জনজীবনের সমস্যাগুলো উপেক্ষা করা গ্রহণযোগ্য নয়।

একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করতে গণতান্ত্রিক সরকার, আইনের শাসন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।

সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ এবং সর্বজনীন অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা ছাড়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের অভাব। রাজনৈতিক দলগুলোতে নেতৃত্ব নির্বাচন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নীতিনির্ধারণে জনগণের মতামত ও অংশগ্রহণ যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না।

বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা প্রতিষ্ঠিত হলে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ অনেক বেশি স্থিতিশীল হতে পারত।

গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো জনগণের মতামত, ভোটাধিকার, আইনের শাসন এবং রাজনৈতিক জবাবদিহিতা। কিন্তু ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি, প্রতিহিংসা এবং দলীয় স্বার্থের কারণে গণতন্ত্রের প্রকৃত বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সুস্থ গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতা প্রতিষ্ঠিত হলে ক্ষমতার পালাবদল স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ঘটতে পারে। জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত হলে নির্বাচনী কারচুপির প্রয়োজন হয় না।

বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ব্যর্থতার দায় প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে এড়ানোর সুযোগ নেই।

ওয়ান-ইলেভেন এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতাকেন্দ্রিক মনোভাব, গণতান্ত্রিক চর্চার অভাব এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করার প্রবণতা এসব সংকটের পেছনে ভূমিকা রেখেছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির উত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়। রাজনৈতিক শূন্যতা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা এবং জনগণের মধ্যে হতাশা এসব শক্তির বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করে।

দেশকে রক্ষা করতে হলে প্রগতিশীল, জাতীয়তাবাদী, অসাম্প্রদায়িক এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সকল গণতান্ত্রিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

বাংলাদেশকে কোনোভাবেই এমন একটি রাষ্ট্রে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না, যেখানে নাগরিক অধিকার, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সংকুচিত হয়ে পড়ে।

রাষ্ট্রের ভিত্তি হতে হবে আইনের শাসন, অর্থনৈতিক অধিকার, সাংস্কৃতিক অধিকার এবং সর্বজনীন মানবিক মর্যাদা।

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপি সরকারের সামনে একটি বড় দায়িত্ব রয়েছে। জনগণের আস্থা অর্জন করতে হলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

রাষ্ট্র সংস্কারের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজনৈতিক দল ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সংস্কার।

প্রত্যেক রাজনৈতিক দলকে দুর্নীতিমুক্ত হতে হবে। রাজনৈতিক দল দুর্নীতিমুক্ত হলে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দুর্নীতির সুযোগ কমে আসবে। রাজনৈতিক দল রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। সেই ভিত্তি দুর্বল হলে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোও দুর্বল হয়ে পড়ে।

কোনো সংসদীয় এলাকার সংসদ সদস্য দুর্নীতিমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক হলে প্রশাসন, ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় ক্ষমতাকেন্দ্রগুলোর মধ্যে দুর্নীতির প্রবণতা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। দুর্নীতিবাজদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ জনগণের সম্পদ। এই সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

জাতীয় সম্পদের লুণ্ঠন ও অপচয় অব্যাহত থাকলে উন্নয়নের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে। দুর্নীতি একদিনে সম্পূর্ণ বন্ধ করা সম্ভব নয়, কিন্তু পর্যায়ক্রমে দুর্নীতির প্রবণতা হ্রাস করা সম্ভব।

রাষ্ট্র, সরকার, রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, ব্যবসায়ী সমাজ এবং জনগণকে সম্মিলিতভাবে দুর্নীতিবিরোধী সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক, জনমুখী এবং উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করতে হবে। কৃষক, শ্রমিক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আজ সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ক্ষমতার রাজনীতি থেকে জনকল্যাণের রাজনীতিতে উত্তরণ।

রাজনীতিবিদদের চিন্তা ও মননে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ, জনগণের কল্যাণ, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার এবং নতুন সভ্যতা নির্মাণের স্বপ্ন থাকতে হবে।

শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনীতি কখনো রাষ্ট্র ও জাতির কল্যাণ নিশ্চিত করতে পারে না।

বাংলাদেশকে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ, গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে জাতীয় সম্পদের লুণ্ঠন বন্ধ করতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্বের সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে।

সরকার পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়, পরিবর্তন হতে হবে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও নেতৃত্বের মানসিকতায়।

সরকার বদলাবে, নেতৃত্ব বদলাবে, কিন্তু দুর্নীতির সংস্কৃতি যদি অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে না।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে দুর্নীতির চক্র ভেঙে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক, গণতান্ত্রিক ও সর্বজনীন কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ওপর।

লেখক: এম এ আলীম সরকার
প্রাবন্ধিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
সভাপতি, বাংলাদেশ গণমুক্তি পার্টি (বিজিপি)