Logo

আন্তর্জাতিক    >>   শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন: ডিসেম্বরের প্রতিশ্রুতি, রাজনৈতিক বাস্তবতা ও নিরাপত্তার কঠিন সমীকরণ

শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন: ডিসেম্বরের প্রতিশ্রুতি, রাজনৈতিক বাস্তবতা ও নিরাপত্তার কঠিন সমীকরণ

শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন: ডিসেম্বরের প্রতিশ্রুতি, রাজনৈতিক বাস্তবতা ও নিরাপত্তার কঠিন সমীকরণ

উত্তম কুমার সাহা, সম্পাদক ও প্রকাশক, প্রজ্ঞা নিউজ:

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ, আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায়ের নাম। তাঁর রাজনৈতিক উত্থান, দীর্ঘদিনের রাষ্ট্র পরিচালনা, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, রাজনৈতিক বিরোধ, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে সমালোচনা এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশত্যাগ—সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি আজও এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চরিত্র। তাঁকে ঘিরে যেমন প্রবল সমর্থন রয়েছে, তেমনি রয়েছে গভীর বিরোধিতা।

আজ বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি প্রশ্ন ক্রমেই আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসছে—শেখ হাসিনা কি সত্যিই দেশে ফিরবেন? ডিসেম্বর মাসে তাঁর প্রত্যাবর্তনের যে ঘোষণা ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা কি বাস্তবে রূপ নেবে, নাকি রাজনৈতিক বক্তব্য ও কূটনৈতিক জটিলতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে?

শেখ হাসিনা নিজেই ডিসেম্বর মাসে দেশে ফেরার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তাঁর প্রত্যাবর্তনের আলোচনা এখন আর কেবল রাজনৈতিক গুঞ্জন নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনীতি, কূটনীতি ও নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে তাঁর প্রত্যাবর্তনের সুনির্দিষ্ট তারিখ, পথ ও নিরাপত্তাব্যবস্থা এখনো নিশ্চিত নয়।

শেখ হাসিনার প্রতি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আবেগ, আনুগত্য ও বিশ্বাস দীর্ঘদিনের। দেশের ভেতরে এবং বিদেশে অবস্থানরত অনেক নেতাকর্মী তাঁর প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছেন। তাঁদের বিশ্বাস, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চারিত হবে। এমনকি সাধারণ মানুষের একটি অংশও তাঁর প্রত্যাবর্তনকে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন।

কিন্তু রাজনৈতিক আবেগ আর বাস্তবতা এক বিষয় নয়। একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরবেন কি না, তা নির্ভর করে কেবল তাঁর ব্যক্তিগত ইচ্ছা কিংবা দলীয় সমর্থকদের আবেগের ওপর নয়। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে আইনি পরিস্থিতি, রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ।

শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান কতটা, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ও ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দল। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী এই দলটির রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক ঐতিহ্য, বিস্তৃত সাংগঠনিক কাঠামো এবং দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে অসংখ্য নেতাকর্মী। কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দলটির সাংগঠনিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে শুরু করে জেলা, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সাংগঠনিক ঐক্য কতটা বজায় রয়েছে, তা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগ, ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় ও ঐক্য এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দলটির অনেক নেতাকর্মী শেখ হাসিনার প্রতি ব্যক্তিগতভাবে অনুগত হলেও দলের বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্বের বিভক্তি, আত্মরক্ষার প্রবণতা এবং রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে বলে অভিযোগ ও আলোচনা শোনা যায়।

প্রশ্ন হচ্ছে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাঁকে স্বাগত জানানোর জন্য দল কতটা প্রস্তুত? তাঁর পাশে দাঁড়ানোর মতো রাজনৈতিক নেতৃত্ব কি তৈরি রয়েছে? নাকি প্রত্যাবর্তনের আবেগকে সামনে রেখে অনেকেই নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছেন?

একটি রাজনৈতিক দল শুধু একজন নেতার জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করে টিকে থাকতে পারে না। দলের আদর্শ, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, নেতৃত্বের ঐক্য, জনসম্পৃক্ততা এবং রাজনৈতিক কর্মসূচির ওপরই তার ভবিষ্যৎ নির্ভর করে।

শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের আগে আওয়ামী লীগের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নিজেদের সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা এবং একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করা।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা যতই জোরালো হোক, তাঁর নিরাপত্তার প্রশ্নটি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নাটকীয় পরিবর্তনের দিন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে দেশত্যাগ করেন। গণভবন, বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা দেশের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাব্যবস্থার গভীর সংকটকে সামনে নিয়ে আসে।

এই ঘটনাগুলো থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা যখন এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়, তখন একজন সাবেক সরকারপ্রধানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কে নেবে?

শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাঁকে ঘিরে রাজনৈতিক সমাবেশ, জনসমাগম কিংবা প্রতিবাদ কর্মসূচি তৈরি হতে পারে। তাঁর সমর্থকদের পাশাপাশি বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির উপস্থিতিও অস্বাভাবিক হবে না। এমন পরিস্থিতিতে কোনো ধরনের সহিংসতা, বিশৃঙ্খলা কিংবা প্রাণহানির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তবে রাজনৈতিক বিরোধিতা এবং সহিংসতা এক বিষয় নয়। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যাঁদের রাজনৈতিক অভিযোগ রয়েছে, তাঁদেরও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। একইভাবে তাঁর সমর্থকদেরও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।

কোনো রাজনৈতিক নেতাকে হত্যা, আক্রমণ কিংবা প্রতিশোধের লক্ষ্যবস্তু করা গণতান্ত্রিক রাজনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

শেখ হাসিনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রের দায়িত্ব, আইনের শাসন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন।

শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। তাঁর প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক শুধু দুই দেশের সরকারপ্রধানের সম্পর্ক নয়। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে বাণিজ্য, সীমান্ত নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, যোগাযোগব্যবস্থা, জ্বালানি সহযোগিতা এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা।

বাংলাদেশ সরকার শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে। অন্যদিকে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে ভারত কী সিদ্ধান্ত নেবে, তা কেবল রাজনৈতিক আবেগ দিয়ে বিচার করা সম্ভব নয়।

ভারতের সামনে রয়েছে কূটনৈতিক সম্পর্ক, প্রত্যর্পণ চুক্তি, আইনি প্রক্রিয়া এবং নিরাপত্তার বিবেচনা। বাংলাদেশে তাঁর প্রত্যাবর্তনের পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি কী হবে, তাঁর বিরুদ্ধে চলমান বিচারিক প্রক্রিয়া কীভাবে পরিচালিত হবে এবং রাজনৈতিক সংঘাতের আশঙ্কা কতটা থাকবে—এসব বিষয় ভারতের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।

ভারত শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে বলেই তাঁকে অনির্দিষ্টকাল নিরাপদে রাখবে, কিংবা বাংলাদেশের অনুরোধে তাঁকে অবিলম্বে ফেরত পাঠাবে—এমন কোনো সিদ্ধান্ত আগাম নিশ্চিত করে বলা যায় না।

এখানে বাংলাদেশের কূটনৈতিক দক্ষতারও পরীক্ষা রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, আন্তর্জাতিক আইন এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে বিষয়টি সমাধান করতে হবে।

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে হলে অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।

দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, কর্মসংস্থান, শিল্প উৎপাদন, বিনিয়োগ, রপ্তানি এবং দ্রব্যমূল্য—এসব বিষয় সাধারণ মানুষের জীবনকে সরাসরি প্রভাবিত করে।

বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এই শিল্পে অস্থিরতা, শ্রমিক অসন্তোষ, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যাওয়া দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

অর্থনৈতিক সংকটের দায় এককভাবে কোনো একটি রাজনৈতিক দলের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমনি বর্তমান সরকারের দায়িত্বও অস্বীকার করা যায় না।

সরকারের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করা, শিল্পকারখানার উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

রাষ্ট্র পরিচালনা কোনো রাজনৈতিক স্লোগানের বিষয় নয়। রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হয় দক্ষতা, পরিকল্পনা, জবাবদিহি ও বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমে।

বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্র। সেখানে কোনো নাগরিক রাজনৈতিক পরিচয়, ধর্ম, সামাজিক অবস্থান কিংবা ব্যক্তিগত মতাদর্শের কারণে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবেন না।

খুন, অপহরণ, চাঁদাবাজি, ডাকাতি, ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা কিংবা রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক মামলা—যে অভিযোগই উঠুক না কেন, তার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইন অনুযায়ী বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

বিশেষ করে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব।

কোনো অপরাধকে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে আড়াল করা যাবে না। আবার কোনো ব্যক্তিকে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করাও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।

বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পরিবর্তে বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা বাড়বে। অপরাধী যে দলেরই হোক, তাকে বিচারের আওতায় আনতে হবে।

শেখ হাসিনার সরকারের সময় মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিরোধী মত দমন এবং রাজনৈতিক নিপীড়নের যে অভিযোগ উঠেছিল, সেগুলোরও নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার প্রয়োজন। একইভাবে বর্তমান সময়ে কোনো নাগরিক অন্যায়ের শিকার হলে তারও বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

ন্যায়বিচার কখনো দলীয় হতে পারে না।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রশ্নে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে জনগণের প্রতিক্রিয়া। তাঁর প্রত্যাবর্তনের সময় কত মানুষ রাজপথে নামবেন, তাঁদের প্রতিক্রিয়া কী হবে এবং দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে—এসব নির্ভর করবে তখনকার বাস্তব পরিস্থিতির ওপর।

শেখ হাসিনার প্রতি আওয়ামী লীগের সমর্থকদের আবেগ রয়েছে। দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর সমর্থকরা রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় রয়েছেন। কিন্তু তাঁর প্রত্যাবর্তনের সময় কত মানুষ রাজপথে নামবেন, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

কেউ কেউ মনে করেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাঁর সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক জনসমাগম হতে পারে। আবার বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির প্রতিক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ হবে।

তবে জনসমর্থন প্রমাণের একমাত্র উপায় রাজপথের জনসমাগম নয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের মতামত প্রকাশের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হচ্ছে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন।

আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে জনগণের ভোটাধিকার, দলের সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

একই সঙ্গে দলটির অতীতের ভুল, রাজনৈতিক বিতর্ক এবং ক্ষমতাকালীন অভিযোগগুলোর মুখোমুখি হওয়ার মানসিকতাও থাকতে হবে।

শেখ হাসিনা একজন দৃঢ়চেতা রাজনৈতিক নেতা। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা সংকট, প্রতিকূলতা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাঁর দেশে ফেরার প্রত্যয় সেই রাজনৈতিক দৃঢ়তারই প্রকাশ হতে পারে।

কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট—শুধু দৃঢ় মনোবল দিয়ে দেশে ফেরার পথ সুগম হবে না।

তাঁর বিরুদ্ধে চলমান বিচারিক প্রক্রিয়া, মৃত্যুদণ্ডের রায়, প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত কূটনৈতিক জটিলতা, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ এবং নিরাপত্তার বাস্তবতা—সবকিছুই তাঁর প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত।

২০২৫ সালে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। তিনি ওই বিচারপ্রক্রিয়া ও রায়ের বৈধতা প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই আইনি বাস্তবতা তাঁর প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নকে আরও জটিল করে তুলেছে।

তাঁর প্রত্যাবর্তন হলে আইন অনুযায়ী কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে তাঁর নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টিও থাকবে।

এখানে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে—একজন রাজনৈতিক নেতার প্রত্যাবর্তন কখনোই রাষ্ট্রের আইন ও বিচারব্যবস্থার ঊর্ধ্বে হতে পারে না। আবার রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে তাঁর জীবন ও নিরাপত্তা বিপন্ন করাও গ্রহণযোগ্য নয়।

বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা অপেক্ষা করছেন, সমর্থকদের মধ্যে প্রত্যাশা রয়েছে, আবার বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে সতর্কতা ও উদ্বেগ রয়েছে।

কিন্তু ডিসেম্বর এলেই শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন—এমন নিশ্চয়তা এখনো নেই। তাঁর প্রত্যাবর্তনের পথ নির্ভর করছে রাজনৈতিক, আইনি, কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত বহু জটিল বিষয়ের ওপর।

শেখ হাসিনা ফিরবেন কি ফিরবেন না, সেটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বাংলাদেশে এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে কোনো রাজনৈতিক নেতাকে হত্যা বা হামলার ভয় নিয়ে চলতে হবে না, কোনো নাগরিককে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নিপীড়িত হতে হবে না এবং কোনো ধর্মীয় সংখ্যালঘুকে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হবে না।

বাংলাদেশের মানুষ শুধু একজন নেতার প্রত্যাবর্তন চায় কি না, সেই প্রশ্নের চেয়েও বড় প্রশ্ন হচ্ছে—তারা কি একটি নিরাপদ, গণতান্ত্রিক, দুর্নীতিমুক্ত, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র চায়?

আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশের মানুষ সেই রাষ্ট্রই চায়।

শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন যদি সত্যিই ঘটে, তবে সেটি যেন প্রতিশোধের নতুন অধ্যায় না হয়ে আইনের শাসন, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার নতুন সুযোগ হয়ে ওঠে।

কারণ বাংলাদেশ কোনো ব্যক্তি, কোনো দল কিংবা কোনো গোষ্ঠীর একক সম্পত্তি নয়। বাংলাদেশ সবার। আর এই দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার একমাত্র বাংলাদেশের জনগণের।