Logo

আন্তর্জাতিক    >>   চিরঞ্জীব বঙ্গবন্ধু: যাঁর অবস্থান আমাদের হৃদয়ে ও চেতনায়

চিরঞ্জীব বঙ্গবন্ধু: যাঁর অবস্থান আমাদের হৃদয়ে ও চেতনায়

চিরঞ্জীব বঙ্গবন্ধু: যাঁর অবস্থান আমাদের হৃদয়ে ও চেতনায়

ড. জাহিদ হোসাইন:
বাঙালির ইতিহাসে কিছু নাম আছে, যা সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে চিরন্তন হয়ে ওঠে। সেই নামগুলোর শীর্ষে অবস্থান করছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা নন—তিনি একটি জাতির স্বপ্ন, সংগ্রাম এবং আত্মপরিচয়ের প্রতীক। তাঁর আদর্শ, ত্যাগ ও সাহস আজও বাঙালির হৃদয়ে অমলিন বলেই তিনি চিরঞ্জীব।
বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ—এই সত্য আজ সর্বজনস্বীকৃত। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নেওয়া এই মহান নেতা শৈশব থেকেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ছিলেন। তাঁর কণ্ঠে ছিল সাহসের উচ্চারণ, হৃদয়ে ছিল মানুষের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা। অন্যায়ের সঙ্গে আপোষহীন অবস্থান তাঁকে বারবার কারাবরণে বাধ্য করলেও, তিনি কখনো পিছু হটেননি।
পাকিস্তানি শাসনামলে বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামে বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেন অবিসংবাদিত নেতা। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বায়ত্তশাসনের দাবি—প্রতিটি আন্দোলনে তাঁর ছিল অগ্রণী ভূমিকা। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে কারাবাসের ইতিহাস—মোট ৪৬৮২ দিন তিনি কারাগারে কাটিয়েছেন। কিন্তু বন্দিদশাও তাঁর মনোবলকে দমাতে পারেনি; বরং আরও দৃঢ় করেছে তাঁর সংগ্রামী চেতনাকে।
১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফা ছিল বাঙালির মুক্তির সনদ। এর মাধ্যমে তিনি অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির সুস্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরেন। এরপর ১৯৬৮ সালের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তাঁকে জড়ানো হলে দেশব্যাপী গণঅভ্যুত্থান গড়ে ওঠে, যার ফলেই ১৯৬৯ সালে তিনি ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত হন।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ ছিল বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণার উৎস। “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”—এই অমর উচ্চারণে জেগে ওঠে পুরো জাতি। ২৫ মার্চের গণহত্যার পর বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হলেও তাঁর আদর্শ ও নির্দেশনায় শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশ।
স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের কঠিন দায়িত্ব নেন বঙ্গবন্ধু। স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি একটি সংবিধান প্রণয়ন করেন, যেখানে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। অর্থনীতি, কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য—সব খাতে তিনি উন্নয়নের ভিত্তি স্থাপন করেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেন তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে।
তবে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়। একদল বিপথগামী সেনা সদস্যের হাতে সপরিবারে নিহত হন এই মহান নেতা। এই নির্মম হত্যাকাণ্ড ছিল বাঙালির স্বপ্নকে নিশ্চিহ্ন করার এক অপচেষ্টা। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—একজন মানুষকে হত্যা করা যায়, তাঁর আদর্শকে নয়।
আজ বঙ্গবন্ধু আমাদের মাঝে শারীরিকভাবে নেই, কিন্তু তাঁর চিন্তা, দর্শন ও সংগ্রাম আমাদের প্রতিনিয়ত পথ দেখায়। তিনি বেঁচে আছেন প্রতিটি আন্দোলনে, প্রতিটি স্বাধীনতার চেতনায়, প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে।
বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের পথে বহুদূর এগিয়েছে। অর্থনীতি, শিক্ষা, প্রযুক্তি—সব ক্ষেত্রে অগ্রগতি দৃশ্যমান। কিন্তু এই অগ্রযাত্রার ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধুই। তাঁর স্বপ্ন ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক, শোষণমুক্ত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ—সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব আজ আমাদের সবার।
নতুন প্রজন্মের কাছে বঙ্গবন্ধু কেবল ইতিহাসের অধ্যায় নন; তিনি এক অনন্ত প্রেরণার উৎস। তাঁর জীবন আমাদের শেখায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে, মানুষের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে এবং দেশপ্রেমকে দায়িত্ব হিসেবে ধারণ করতে।
আজ তাঁর জন্মদিনে কিংবা স্মরণ দিবসে আবেগের পাশাপাশি প্রয়োজন অঙ্গীকার—দুর্নীতিমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গঠনের অঙ্গীকার। বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথেই আমরা গড়ে তুলতে পারি একটি উন্নত ও মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ।
বঙ্গবন্ধু কোনো নির্দিষ্ট সময়ের নন; তিনি সকল সময়ের, সকল প্রজন্মের। তাঁর আদর্শ কখনো পুরোনো হয় না—বরং প্রতিনিয়ত নতুন করে আমাদের অনুপ্রাণিত করে। তাই তিনি চিরঞ্জীব—আমাদের হৃদয়ে, চেতনায় এবং স্বপ্নে।
জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।


ড. জাহিদ হোসাইন, সাধারণ সম্পাদক, ভার্জিনিয়া আওয়ামী লীগ।