বঙ্গবন্ধু উপাধি: জাতির জাগরণের ঐতিহাসিক মহেন্দ্রক্ষণ — ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯
হাকিকুল ইসলাম খোকন:
বাংলার ইতিহাসে ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ এক অনন্য আলোকবর্তিকা। সেই দিনটি শুধু একটি উপাধি প্রদানের দিন ছিল না—ছিল একটি জাতির আত্মপ্রত্যয়ের উন্মেষ, সংগ্রামের স্বীকৃতি এবং নেতৃত্বের প্রতি অগাধ ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) রূপ নিয়েছিল এক উত্তাল জনসমুদ্রে।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে সদ্য কারামুক্ত বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান যখন মঞ্চে এসে দাঁড়ালেন, তখন চারদিক মুখরিত হয়ে উঠেছিল “জয় বাংলা” ধ্বনিতে। লক্ষ লক্ষ মানুষের উপস্থিতি যেন ঘোষণা করছিল—এই নেতা শুধু একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নন, তিনি বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক, স্বাধীনতার অদম্য প্রেরণা।
সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে তৎকালীন তুখোড় ছাত্রনেতা, ডাকসুর ভিপি তোফায়েল আহমেদ মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে উচ্চারণ করেন এক অবিস্মরণীয় ঘোষণা। দশ লক্ষ মানুষের গগনবিদারী স্লোগান ও করতালির মধ্যে আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন
“যে নেতা তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো কাটিয়েছেন পাকিস্তানের অন্ধকার কারাগারে, ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়েও যিনি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে দ্বিধা করেননি; সেই প্রিয় নেতাকে আজ আমরা কৃতজ্ঞ চিত্তে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করছি।”
এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসে যুক্ত হয় এক অমর অধ্যায়। “বঙ্গবন্ধু”—অর্থাৎ বাংলার বন্ধু, বাংলার প্রাণের মানুষ। এই উপাধি ছিল বাঙালির হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতির স্বীকৃতি। এটি ছিল সংগ্রামী নেতৃত্বের প্রতি জাতির আস্থা, ভালোবাসা ও ভবিষ্যৎ স্বাধীনতার অঙ্গীকার।
১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে এই উপাধি ছিল কেবল আবেগ নয়, ছিল রাজনৈতিক বাস্তবতার এক শক্তিশালী বার্তা। এর মধ্য দিয়েই স্পষ্ট হয়ে ওঠে—বাংলার মানুষের মুক্তির পথের দিশারী হয়ে উঠেছেন শেখ মুজিবুর রহমান। পরবর্তীকালে তাঁর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ সেই স্বীকৃতিকে চূড়ান্ত রূপ দেয়।
২৩ ফেব্রুয়ারি তাই কেবল একটি তারিখ নয়; এটি বাঙালির আত্মমর্যাদা ও জাতীয় চেতনার এক মহেন্দ্রক্ষণ।
এই মহান মানুষটির প্রতি রইল আজীবন শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও অফুরন্ত ভালোবাসা।
বঙ্গবন্ধু অমর—বাংলার ইতিহাসে, বাংলার হৃদয়ে। হাকিকুল ইসলাম খোকন, সিনিয়র সাংবাদিক ও সংগঠক।


















