Logo

আন্তর্জাতিক    >>   অবশেষে ‘ঠাণ্ডা-লড়াইয়ে’ জয়ী হলেন ওয়াকার: দিলওয়ার হোসেন কয়েছ

অবশেষে ‘ঠাণ্ডা-লড়াইয়ে’ জয়ী হলেন ওয়াকার: দিলওয়ার হোসেন কয়েছ

অবশেষে ‘ঠাণ্ডা-লড়াইয়ে’ জয়ী হলেন ওয়াকার: দিলওয়ার হোসেন কয়েছ

প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক:

সেনাবাহিনীর জনপ্রিয় প্রবাদমতে—অস্ত্র ছাড়াই যুদ্ধ জিতেই ফেলেছেন জেনারেল ওয়াকার। গত পনের মাস ধরে সেনানিবাসে বিগত সরকারের পতনের জন্য যে নীরব কৌশল চালানো হচ্ছিল, তাতে জয়ী হয়েছেন তিনি। ইন্টেরিম সরকারের সঙ্গে তাঁর ‘বঙ্গবন্ধু বান্ধব’ সমঝোতা, সমর্থিত অংশদের কৌশলগত চালচলন, এবং রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে প্রদর্শিত ‘আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল’ ছবিটি—এগুলি মিলিয়ে ওয়াকারই শেষ হাসি হাসলেন।
আসল সফটপয়েন্টটি ছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আওতায় গুজরন করা তিনটি মামলায় ২৫ জন সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়া। মামলা সূত্রে অভিযুক্তদের সেনানিবাসে রাখা ছিল; ধারণা করা হচ্ছিল তারা নিজস্ব আইনজীবীর পরামর্শে ট্রাইব্যুনালের ওয়ারেন্ট চ্যালেঞ্জ করবেন, কিংবা সেনাপ্রধান সমঝোতা করে সুরাহা করবেন। কিন্তু নির্দিষ্ট দিনে—২২ অক্টোবর—অভিযুক্তদের মধ্যে ১৫ জনকে আদালতে সোপর্দ করা হয়। আদালত তাদের সেনানিবাসের সাব-জেলে পাঠান; এছাড়া তাদের চাকরি থেকেও বরখাস্ত করা হয়েছে। সংক্ষেপে, একটি অর্ডিন্যান্সের ফলে তারা এখন বরখাস্তকৃত সেনা অফিসার হিসেবে বিচারবিভাগীয় ব্যবস্থার আওতায় রয়েছেন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে—ওয়াকার কি এই পরিস্থিতি এড়াতে পারতেন? ঘটনাপ্রবাহ দেখানো যে তিনি এড়াতে চাননি; বরং তার চালচলন থেকেই বোঝা যায় তিনি নিজস্ব কৌশল অবলম্বন করেছেন। যাদের তিনি নিরপেক্ষ বা সফট হিসেবে পরিচিত করিয়েছিলেন—যারা ইন্টেরিম সরকারের সঙ্গে সৌম্য আচরণ ও নিরাপদ বিচ্ছিন্নতা চান, নির্বাচন দ্রুত চান—তারা এখন ওয়াকারের আচরণ দেখে কাঁচা-মূল্য বোঝাতে পারেন।
নীতি ও ঘটনাবলি সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
১) পাঁচ আগস্টে কারফিউ ভাঙা ও গণবিভ্রাটের সময় শেখ হাসিনাকে রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হওয়া; বরং ব্যারিকেড খুলে এনএসএফ সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
২) তিন আগস্টে ঘোষণা ছিল—সেনারা ছাত্রদের ওপর গুলি চালাবে না; চার আগস্ট পর্যন্ত শেখ হাসিনাকে আশ্বস্ত করে বলা হয়েছিল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
৩) ভারতের এনএসএ’র দোভাল ও সেনাপ্রধান দ্বিবেদীর ফোনে সেনারা যখন প্রধানমন্ত্রীর ত্যাগ-বিকল্প নিয়ে কাজ করছিল, তখন ওয়াকার জামাত নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে ছিলেন।
৪) পাঁচ আগস্ট রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণের ঘোষণা দেন; দলগুলোর সঙ্গে বৈঠকে প্রথমে জামাতকে ডাকেন এবং ভাষণে প্রথমে জামাতের নাম উচ্চারণ করেন। পরে ‘মাননীয়’ শব্দ সংশোধন করে ‘প্রধানমন্ত্রী’ বলা হয়।
৫) আট আগস্টে মুহাম্মদ ইউনূসকে বিমানবন্দরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গ্রহণ করা হয়; প্রেসিডেন্টের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। ইউনূস-পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত সরকারকে পূর্ণ সমর্থন দেন এবং পরবর্তী সময়ে সরকারের কাজগুলোকে সমর্থন প্রদর্শন করেন।
৬) ম্যাজিস্ট্রেসি থাকার পরও দেশে ব্যাপক নৈরাজ্য চলাকালীন—আ’লীগ ও ১৪ দলের নেতা-কর্মীদের উপর হামলা, গ্রেপ্তার এবং সমগ্র দেশে প্রতীক-ভাঙচুর—ওয়াকার কোনো বাধা দেননি; কিছু ক্ষেত্রে সেনা সদস্যরাও এসব ঘটনায় অংশগ্রহণ করেন বলে অভিযোগ ওঠে।
৭) ২৬ ফেব্রুয়ারি এক ভাষণে তিনি ‘আই হ্যাড এনাফ ইজ এনাফ’ বলে বক্তব্য দেন; এর আগে ইউনূস সরকার ও এনসিপি তাঁকে সরানোর উদ্যোগ নিয়েছিল, কিন্তু তিনি নির্বিকার ছিলেন। রাশিয়া সফরের সময় ইউনূস-খলিলুর রহমানকে ‘জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা’ হিসেবে নিয়োগ দিলেন; প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট হিসেবে সেটি ওয়াকারের অপসারণকে লক্ষ্য করেছিল।
৮) জামাত-নেতাদের সঙ্গে বহুবার বৈঠক এবং ইউনূসের ‘পদত্যাগ নাটক’ পরবর্তী কৌশল আর আল্টিমেটাম—এসব পদক্ষেপ মিলিয়ে ওয়াকার রাজনৈতিকভাবে নিজেকে এমন অবস্থানে দাঁড় করান যেখানে তিনি ইউনূস ও এনসিপির সঙ্গে জোট করে চলতে পারে।
ওয়াকার বারবার বলেছেন—তাঁর রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা নেই। কিন্তু বারংবার এই বক্তব্য প্রচার করলে সে কথাটির বিপরীত সম্ভাব্য ব্যাখ্যা জন্মায়। রাজনীতির মাঠে কোনো চরম শূণ্যস্থান বা ‘ভ্যাকুয়াম’ থাকে না; সেনাপ্রধানের মেয়াদ শেষ হলে (২০২৭ সালের ২২ জুন) দলে-দলে স্থানান্তর ও নতুন রাজনৈতিক বিন্যাস হতে পারে। ওয়াকার যে সেনা-রাজনীতি সম্পর্কে অভিজ্ঞ, তা অস্বীকার করা যায় না; তাই তাঁর সমর্থন তুলে নিলে বর্তমান শাসন দ্রুত দুর্বল হতে পারে।
এছাড়া ১৫ জন অফিসারের জেলে পাঠানোর পর ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি অজানা হলেও কিছু আশঙ্কা স্পষ্ট করা যায়। প্রথমত, যে ঘটনার রেফারেন্স টানা হচ্ছে—র‌্যাবের পুরনো কার্যক্রম, অপারেশন ক্লিনহার্ট এবং ২০০১–২০০৮ সময়ের মাঝে র্যাব, ডি.জি.এফ.আই., এস.বি., ডি.বি. ও অনান্য নিরাপত্তা সংস্থার কর্মকাণ্ড—এসব ক্ষেত্রে কেন একই ধাঁচে দায় গ্রহণ হবে না, সেই প্রশ্ন উঠবে। চাকরিরত অবস্থায় শপথ ভঙ্গ করে বিগত সরকারের বিরুদ্ধেও শক্ত কণ্ঠে প্রতিবাদ হলে তা কি অপরাধ হতেই হবে? ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের ঘটনা এবং যদি সেনা কর্তারা দোষী সাব্যস্ত হন, তাহলে তাদের কমান্ডিং অফিসার হিসেবে সেনাপ্রধান কেন অভিযুক্ত হননি—এসব বিষয়ও আইনের অন্তর্গত অসামঞ্জস্যের ইঙ্গিত দেয়।
বাংলাদেশের ইতিহাসে সেনা জড়িত হয়ে বহুবার ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটেছে; এগুলো সংবিধানের ৭ম সংশোধনী অনুযায়ী রাষ্ট্রদ্রোহ ধরা হয়েছে। ইতিহাস দেখায়—সেনাবাহিনীর শীর্ষস্তরের কিছু অংশ কখনও জনগণের স্বার্থমুখী ছিল না। ধর্মনির্বাহী ও সামরিক সংস্কৃতি মিশে যাওয়া, এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সেনা ব্যবহারের ইতিহাস রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার প্রশ্ন তোলে। একইরকম অপরাধের ক্ষেত্রে একজন বা একশ’র বিচার হলে কিন্তু একটি সমতুল্য ও ন্যায়সংগত প্রয়োগ আশা করা উচিত।
১৫ সেনা কর্মকর্তাদের জেলে পাঠানোর পর সেনানিবাসের অভ্যন্তরে কী ঘটবে তা অনিশ্চিত। তবে সাধারণভাবে অনুমান করা যায়—দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীর মধ্যে চেইন অব কমান্ড ও নৈতিকতা ভেঙে পড়বে। গত পনের মাসে নিখুঁতভাবে সাজানো পরিকল্পনা সেনাবাহিনীকে ভেতরভাগে দলবদ্ধ করে দুর্বল ও বিশৃঙ্খল করা হয়েছে; এবার অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে শেষ পেরেক ঠোকা হলো। যদি উদ্দেশ্য থাকে ‘দেশ রক্ষার বিশেষ মিলিশিয়া’ গঠন বা বাহ্যিকভাবে অন্য কোনো শক্তির স্বার্থ হাসিল, তাহলে দেশের সামনে ভয়াবহ সংকট ঘনীভূত হবে—সম্ভবত ইরাক, সিরিয়া বা লিবিয়ার মতো পরিস্থিতির চেয়েও বেশি বিপজ্জনক, এমন আশঙ্কা জরুরি।
সবশেষে, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় তা হলো—রাজনৈতিক ও সামরিক মধ্যস্থতা, বিচারপ্রক্রিয়ার অনিয়ম ও একতরফা কার্যক্রম দেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, স্বাধীনতা ও ন্যায়ের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করতে পারে। জনগণ, রাজনীতিক দল ও সামরিক প্রতিষ্ঠানকে এখন অত্যন্ত সতর্ক ও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে—নাহলে দেশের ভবিষ্যৎ গভীর সঙ্কটাপন্ন হবে।
দিলওয়ার হোসেন কয়েছ,
সাধারণ সম্পাদক,ফ্রান্স আওয়ামী লীগ।