নিউইয়র্কে হোমকেয়ার সেবায় বড় পরিবর্তন: একক তদারকির দায়িত্ব পেল পিপিএল: বাংলাদেশি কম্যুনিটিতে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, অনিয়ম রোধে গভর্ণরের কৌশলগত পদক্ষেপ
প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক:
নিউইয়র্কের হোমকেয়ার সেবাখাতে আসছে আমূল পরিবর্তন। সিডিপ্যাপ (Consumer Directed Personal Assistance Program) এর আওতায় পরিচালিত এই জনপ্রিয় সেবাটি এখন থেকে এককভাবে তদারকি করবে জর্জিয়াভিত্তিক পাবলিক পার্টনারশিপ এলএলসি বা পিপিএল। নিউইয়র্ক স্টেট হেলথ ডিপার্টমেন্ট অনুমোদিত এই প্রতিষ্ঠানটি সেবা গ্রহিতা ও সেবাদাতাদের দৈনন্দিন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করবে।
২০২৫ সালের এপ্রিলের আগেই সকল সিডিপ্যাপ ভোক্তাদের পিপিএলের সঙ্গে তালিকাভুক্ত হবার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি নিউইয়র্কে কোনো অফিস না খুললেও টেলিফোন (১-৮৩৩-২৪৭-৫৩৪৬) এবং অনলাইন (pplfirst.com/cdpap) প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কার্যক্রম চালাচ্ছে। কিন্তু প্রযুক্তিগত সক্ষমতা না থাকায় অনেক প্রবাসী প্রবীণ নাগরিক এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে হিমশিম খাচ্ছেন।
নিউইয়র্ক সিটির ব্রুকলিনে দীর্ঘদিন ধরে হোমকেয়ার সেবার সঙ্গে জড়িত প্রো হেলথ হোমকেয়ারের অভিজ্ঞ প্রধান নির্বাহী জানান, দীর্ঘদিন ধরে পর্যবেক্ষণ ও যথাযথ মনিটরিংয়ের অভাবে এই সেবাখাতে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ অপচয়ের অভিযোগ উঠেছে। এই সুযোগে অসুস্থ না হয়েও বহু ব্যক্তি ডাক্তারের সার্টিফিকেট নিয়ে হোমকেয়ারের সুবিধা নিয়েছেন। কেউ কেউ বাংলাদেশে থেকেও চিকিৎসা-ভাতা গ্রহণ করেছেন। এমনকি মৃত্যুর পরও অনেকের নামে সেবা চালু থাকার ঘটনা ঘটেছে।
সেবাদাতাদের মধ্যেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। কেউ কেউ ফুলটাইম অন্য চাকরির পাশাপাশি সপ্তাহে ১৪০ ঘণ্টার ভাতা ড্র করছেন। দৈনন্দিন বাস্তবতায় যা একেবারেই অসম্ভব। অনেকেই দিনের ২০ ঘণ্টা কাজ করছেন— এমন দাবি করে সরকারের কাছ থেকে ভাতা নিচ্ছেন। অথচ এসময় তারা সুপারমার্কেট, এয়ারপোর্ট বা অন্য কর্মস্থলে চাকরিতে নিয়োজিত ছিলেন।
এসব অনিয়মের প্রেক্ষিতে স্টেট গভর্ণর ক্যাথি হোকুল কৌশলগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন হোমকেয়ার সেবার মনিটরিংয়ের দায়িত্ব পিপিএলকে দেওয়া হবে। ধারণা করা হচ্ছে, পিপিএল প্রতিটি সেবা গ্রহিতাকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ট্র্যাক করবে। একইসঙ্গে সেবাদাতার গতিবিধিও নজরদারিতে থাকবে। এতে সেবা না দিয়ে ভাতা নেয়ার সুযোগ অনেকাংশে বন্ধ হয়ে যাবে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে নিউইয়র্ক স্টেটের প্রায় ৬০০-এর বেশি হোমকেয়ার এজেন্সির ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় পড়েছে। তারা হয়ত পিপিএলের ব্রোকার হিসেবে কাজ করবে, নয়তো সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। অনেক ফুলটাইম কর্মচারী কর্মহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে সরকার বলছে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রতি বছর কয়েক বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় সম্ভব হবে।
বাংলাদেশি কম্যুনিটিতে এ নিয়ে প্রচণ্ড উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। নিউইয়র্ক স্টেটে প্রায় ৫০ হাজার বাংলাদেশি হোমকেয়ার সেবার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। অনেকেই এই পেশার আয় দিয়ে বাড়ি কিনেছেন, পরিবার চালাচ্ছেন। হঠাৎ এই পরিবর্তনে অনেকের আয়ের পথ রুদ্ধ হবার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
একদিকে পিপিএলের মাধ্যমে সেবার মান নিশ্চিত করা সম্ভব হলেও অন্যদিকে এটি মানুষের ব্যক্তিগত, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক সুবিধাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। প্রবাসী প্রবীণরা নিজস্ব ভাষায় কথা বলে, পরিচিত পরিবেশে সেবা পেতে অভ্যস্ত। আত্মীয়ের সেবা নেওয়ার পরিবর্তে এখন হয়তো ভিনদেশি সেবাদাতা আসবে, যাদের সঙ্গে তারা মানসিকভাবে সহজ হতে পারবেন না।
আরেকটি বড় পরিবর্তন হচ্ছে— পিপিএল কর্তৃক নতুনভাবে প্রশিক্ষণের বাধ্যবাধকতা। যাদের চিকিৎসা জ্ঞান নেই, তারা আর এই পেশায় থাকতে পারবেন না। ফলস্বরূপ, মা-বাবা, ভাই-বোনকে সেবা দেয়ার সুযোগ অনেক ক্ষেত্রে হারিয়ে যাবে। একইসাথে প্রতি ঘন্টায় মজুরি ২-৩ ডলার কমারও সম্ভাবনা রয়েছে, যা আরও দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যদিও কেউ কেউ বলছেন, নিয়মমাফিক সেবা প্রদানকারী ব্যক্তিরা ভবিষ্যতে আরও ভালো অবস্থানে পৌঁছাতে পারেন, তবে যারা অনিয়মের মাধ্যমে সুবিধা নিয়েছেন, তাদের জন্য এটি হবে বড় ধাক্কা। মামলা-মোকদ্দমার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
অনেকের মতে, পিপিএল যদি কম্যুনিটির ভেতরে থেকেই কাজ করে, তাহলে হয়ত এই ট্রানজিশন সহজ হতে পারে। তবে একক প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্বে পুরো সেক্টর তুলে দেওয়া কতটা বাস্তবসম্মত হবে— তা সময়ই বলবে।
এই মুহূর্তে প্রয়োজন— সরকার, পিপিএল এবং কম্যুনিটির নেতৃবৃন্দের মধ্যে স্বচ্ছ ও বাস্তবভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো, যাতে সেবা অব্যাহত থাকে, অনিয়ম বন্ধ হয় এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত না হয়।
সূত্র: nyvoice24.



















