Logo

আন্তর্জাতিক    >>   কৌশলগত দূরত্ব নাকি সাময়িক নাটক? বিএনপি-জামায়াত বিরোধের অন্তরালের বাস্তবতা

কৌশলগত দূরত্ব নাকি সাময়িক নাটক? বিএনপি-জামায়াত বিরোধের অন্তরালের বাস্তবতা

কৌশলগত দূরত্ব নাকি সাময়িক নাটক? বিএনপি-জামায়াত বিরোধের অন্তরালের বাস্তবতা

নয়ন বিশ্বাস রকি:
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার বর্তমান বিরোধিতাকে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক “আর্টিফিশিয়াল” বা কৃত্রিম বলে আখ্যায়িত করছেন। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দলের প্রকাশ্য দূরত্ব তৈরি হলেও, এর পেছনের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্ক বিশ্লেষণ করলে ভিন্ন একটি চিত্র সামনে আসে।
১৯৯৯ সালে গঠিত চারদলীয় জোটে বিএনপি ও জামায়াত ছিল প্রধান শরিক। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তারা একসাথে সরকার পরিচালনা করেছে, যেখানে জামায়াতের দুইজন মন্ত্রীও মন্ত্রিসভায় ছিলেন। প্রায় আড়াই দশকের এই রাজনৈতিক সহাবস্থান হঠাৎ করেই পুরোপুরি ভেঙে যাওয়া বাস্তবসম্মত নয়—এমনটাই মনে করেন বিশ্লেষকরা।
তৃণমূল রাজনীতির বাস্তবতাও এই ধারণাকে জোরালো করে। বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে এখনো বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের একসাথে সক্রিয় অংশগ্রহণ দেখা যায়। ২০২৩-২৪ সালের রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলোতেও তাদের সমন্বিত অবস্থান ছিল লক্ষণীয়। ইউনিয়ন পর্যায়ে ভোটের হিসাব-নিকাশও অনেক ক্ষেত্রে যৌথভাবেই পরিচালিত হয়।
আদর্শিক দিক থেকেও দুই দলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে। উভয় দলই “বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ” ও ইসলামী মূল্যবোধের ওপর গুরুত্বারোপ করে এবং আওয়ামী লীগকে প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করে। সংবিধানের মৌলিক কিছু প্রশ্ন, বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতেও তাদের অবস্থান প্রায় অভিন্ন।
বিরোধের সময়কাল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নির্বাচনের পরবর্তী সময় বা সরকারবিরোধী আন্দোলনের স্থবির পর্যায়েই এই দ্বন্দ্ব তীব্র আকার ধারণ করে। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর এবং ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের পর এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ফলে অনেকের কাছে এটি কৌশলগত দূরত্ব তৈরির একটি অংশ বলেই প্রতীয়মান হয়।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বিএনপিকে জামায়াতের সঙ্গে জোট নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোর বিভিন্ন নীতি ও পর্যবেক্ষণের কারণে বিএনপি মাঝে মাঝে নিজেদের অবস্থান পুনর্বিন্যাসের চেষ্টা করে। এই প্রেক্ষাপটে প্রকাশ্য দূরত্ব অনেক সময় কূটনৈতিক চাপ মোকাবিলার একটি কৌশল হিসেবেও বিবেচিত হয়।
যদিও শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে বক্তব্য ও পাল্টা বক্তব্যে দ্বন্দ্ব স্পষ্ট, বাস্তবে প্রার্থী বাছাই, সাংগঠনিক কাঠামো এবং রাজনৈতিক পরিকল্পনায় সমঝোতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। অর্থাৎ, নেতৃত্বের বিরোধ থাকলেও মাঠপর্যায়ে ঐক্যের একটি ধারা এখনো বজায় রয়েছে।
রাজনীতিতে স্থায়ী শত্রু বা মিত্র বলে কিছু নেই—এই বাস্তবতা নতুন নয়। বিএনপি-জামায়াতের বর্তমান সম্পর্ককে অনেকেই “Good Cop, Bad Cop” কৌশলের সঙ্গে তুলনা করেন। একদিকে একটি পক্ষ নরম অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা করে, অন্যদিকে আরেকটি পক্ষ কঠোর অবস্থান ধরে রেখে কর্মীদের সক্রিয় রাখে। তবে শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য একটাই—রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন।
সবশেষে বলা যায়, বিএনপি-জামায়াতের বর্তমান বিরোধকে স্থায়ী বিচ্ছেদ হিসেবে দেখা কঠিন। বরং এটি সময় ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি কৌশলগত অবস্থান বা সাময়িক মান-অভিমান বলেই প্রতীয়মান হয়। রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় ভবিষ্যতে আবারও তাদের একসাথে পথচলার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
নয়ন বিশ্বাস রকি, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও সমাজসেবক।