বাংলাদেশের কুমিল্লায় সনাতনী কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীর মরদেহ উদ্ধার: ময়নাতদন্ত শেষে টুঙ্গিপাড়ায় শেষকৃত্য সম্পন্ন
প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক:
বাংলাদেশে চট্টগ্রাম থেকে প্রশিক্ষণ শেষে রাতে কুমিল্লার বাসায় ফিরছিলেন বুলেট বৈরাগী (৩৫) নামের এক সনাতনী কাস্টমস কর্মকর্তা। কাছাকাছি স্থানে পৌঁছে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথাও বলেছিলেন। এরপরই হঠাৎ তাঁর মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। সকালে মহাসড়কের পাশে তাঁর মরদেহ পাওয়া গেছে। তাঁর মুখমণ্ডলে রক্তাক্ত চিহ্ন দেখা গেছে।
গতকাল শনিবার (২৫ এপ্রিল) সকাল আটটার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার কোটবাড়ী এলাকার আইরিশ হিল হোটেলের পাশ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে বেলা একটার দিকে পরিবারের সদস্যরা হাইওয়ে থানায় গিয়ে নিহত ব্যক্তির মরদেহ শনাক্ত করেন।
নিহত বুলেট বৈরাগী গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার বাসিন্দা সুশীল বৈরাগীর ছেলে। তিনি ৪১তম বিসিএস নন-ক্যাডার হিসেবে ঢাকা কাস্টমস কার্যালয়ে যোগদান করেন। সর্বশেষ কুমিল্লার বিবিরবাজার স্থলবন্দরে কর্মরত ছিলেন। সেখানে থেকেই ১১ এপ্রিল প্রশিক্ষণে চট্টগ্রামে যান। চাকরির সুবাদে তিনি কুমিল্লা নগরের রাজগঞ্জ পানপট্টি এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। তাঁর বাবা, মা ও স্ত্রী ছাড়াও ৯ মাস বয়সী এক ছেলেসন্তান আছে।
পুলিশ ও নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ৪৪তম বনিয়াদি প্রশিক্ষণে অংশ নিতে ১১ এপ্রিল চট্টগ্রাম যান বুলেট বৈরাগী। গত শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) প্রশিক্ষণ শেষে রাত ১১টার দিকে তিনি চট্টগ্রামের অলঙ্কার মোড় থেকে ঢাকার একটি বাসে ওঠেন। সর্বশেষ রাত ২টা ২৫ মিনিটের দিকে পরিবারের সঙ্গে তাঁর কথা হয়। তখন জানিয়েছিলেন, তিনি কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকায় নেমে রাজগঞ্জ পানপট্টির বাসায় ফিরবেন। এর পর থেকে তাঁর মুঠোফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। আজ বেলা ১১টার দিকে তাঁর বাবা কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় এ–সংক্রান্ত একটি অভিযোগ করেন।
ময়নামতি হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল মমিন বলেন, জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল পেয়ে সকাল পৌনে ৮টার দিকে কোটবাড়ী এলাকার মহাসড়কের চট্টগ্রামমুখী লেনের পাশ থেকে অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে বেলা একটার দিকে পরিবারের সদস্যরা থানায় গিয়ে মরদেহটি বুলেট বৈরাগীর বলে শনাক্ত করেন। তিনি বলেন, ওই ব্যক্তির মুখমণ্ডল কিছুটা রক্তাক্ত থাকলেও শরীরে বড় কোনো আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়নি।
নিহত বুলেটের মা নীলিমা বৈরাগী বলেন, ‘শুক্রবার রাত আড়াইটার পর ছেলের মোবাইল ফোন থেকে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা কয়েকবার কথা বলেন, এর পর থেকেই ফোনটি বন্ধ হয়ে যায়। আমার ছেলে বাস থেকে পদুয়ার বাজারে নামার কথা। কিন্তু কোটবাড়ীতে লাশ পাওয়া গেছে, সেখানে তার যাওয়ার কথা না।’ তাঁর দাবি, এটি একটি হত্যাকাণ্ড। তিনি পুরো ঘটনা তদন্ত করে দেখার দাবি জানিয়েছেন।
কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘সকালে পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করতে আসে। তখন আমরা তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারে দেখি, তাঁর মুঠোফোন সর্বশেষ কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার একটি এলাকা পর্যন্ত চালু ছিল। পরে তাদের সদর দক্ষিণ থানায় যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছি। এরপর তারা আমাদের কাছে একটি অভিযোগ দিয়ে যায়। সর্বশেষ যেখানে লাশ উদ্ধার হয়েছে, এটিও সদর দক্ষিণ থানা এলাকায় পড়েছে। এ ঘটনায় মামলা সদর দক্ষিণ থানায় হবে।
যোগাযোগ করলে সদর দক্ষিণ মডেল থানার ওসি সিরাজুল মোস্তফা সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। তবে মুখমণ্ডলের রক্তাক্ত চিহ্ন দেখে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, এটি দুর্ঘটনা হতে পারে। যদিও এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। পুলিশ ঘটনাটির তদন্ত শুরু করেছে। এ ঘটনায় আইনি প্রক্রিয়া চলমান।
কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীর মরদেহ আজ রবিবার (২৬ এপ্রিল) ময়নাতদন্ত শেষে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বেলা ১১টায় মরদেহ গ্রহণের পর দুপুর ১২টায় কাস্টমস কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকতা শেষে তার মরদেহ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ময়নাতদন্ত শেষে দুপুরেই মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সেখানে স্বজনদের উপস্থিতিতে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। পারিবারিক সূত্র আরোও জানায়, গত ১১ এপ্রিল সরকারি প্রশিক্ষণে যোগ দিতে তিনি চট্টগ্রামে যান। শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) রাত ১১টার দিকে প্রশিক্ষণ শেষে চট্টগ্রামের অলঙ্কার মোড় থেকে বাসে করে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। পথে পরিবারের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। সর্বশেষ রাত ১টা ২৫ মিনিটে ফোন করে তিনি জানান, কুমিল্লা নগরীর টমছমব্রিজ চৌরাস্তার মোড়ে পৌঁছেছেন।
এরপর দীর্ঘ সময় কেটে গেলেও তিনি বাসায় না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। সম্ভাব্য সব স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও কোনো তথ্য না পেয়ে শনিবার সকালে তার বাবা সুশীল বৈরাগী কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। সূত্র: প্রথম আলো, আজকাল



















