Logo

আন্তর্জাতিক    >>   খাপড়া ওয়ার্ড দিবস: ১৯৫০ সালের রাজশাহী কারাগারের শহীদদের সাহস, ত্যাগ এবং অবিচল চেতনার স্মরণে

খাপড়া ওয়ার্ড দিবস: ১৯৫০ সালের রাজশাহী কারাগারের শহীদদের সাহস, ত্যাগ এবং অবিচল চেতনার স্মরণে

খাপড়া ওয়ার্ড দিবস: ১৯৫০ সালের রাজশাহী কারাগারের শহীদদের সাহস, ত্যাগ এবং অবিচল চেতনার স্মরণে

ডা. আজিজ :

দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক সহিংসতা প্রায়ই কারাবাস, অভ্যুত্থান বা রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের সঙ্গে যুক্ত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে প্রকাশ পায়, যদিও তা সবসময় কারাগারের ভেতরে ঘটে না। এই অঞ্চলে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, অভ্যুত্থানের পর মৃত্যুদণ্ড, আটক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের হত্যা এবং রাষ্ট্র-সমর্থিত বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হেফাজতে নির্যাতনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এই ধারা আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কা জুড়ে দেখা যায়।
আজ এখানে আমি একটি অত্যন্ত নির্দিষ্ট এবং ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার কথা তুলে ধরছি: পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) কারাগারের ভেতরে সংঘটিত প্রথম নথিভুক্ত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, যা রাজশাহী কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ড ঘটনার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। এটি এই অঞ্চলের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ, দুঃখজনক এবং ঐতিহাসিক স্থান অধিকার করে আছে।
১৯৪৭ সালের পর পাকিস্তান রাষ্ট্র পূর্ব বাংলায় ব্যাপক অস্থিরতার মুখোমুখি হয়। কৃষক, ছাত্র এবং শ্রমিকরা—যাদের অনেকেই বামপন্থী ও সাম্যবাদী চিন্তাধারায় প্রভাবিত—অধিকার ও ভূমি সংস্কারের দাবিতে সংগঠিত হতে শুরু করেন। তেভাগা আন্দোলন, যা রাজশাহীতে ইলা মিত্র, ময়মনসিংহে মণি সিংহ এবং যশোরে আব্দুল হক-এর নেতৃত্বে পরিচালিত হয়, পাশাপাশি রেলওয়ে, টেক্সটাইল এবং কলকারখানার শ্রমিক আন্দোলন উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তোলে।
ফলস্বরূপ, রাষ্ট্র কঠোর দমন-পীড়নের পথ বেছে নেয়। হাজার হাজার কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়, কমিউনিস্ট সংগঠকদের রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, এবং রাজশাহী কারাগার রাজনৈতিক বন্দীদের একটি প্রধান আটককেন্দ্রে পরিণত হয়।
কারাগারের ভেতরে পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ: অল্প খাদ্য, কঠোর পরিশ্রমে বাধ্য করা, এবং সামান্য বিশ্রাম নিলেও নির্যাতন চলত। রাজনৈতিক বন্দীরা, বিশেষ করে মার্কসবাদীরা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে শুরু করেন। তারা ঢাকা, রাজশাহী এবং খুলনা কারাগারে একাধিক অনশন কর্মসূচি পালন করেন, যা ১৯৪৯ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ১৫০ দিন স্থায়ী হয়।
দুটি মৃত্যু পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে: ঢাকা কারাগারে জোরপূর্বক খাওয়ানোর সময় শিবেন রায় মারা যান এবং খুলনা কারাগারে বিষ্ণু বৈরাগীকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এই ঘটনাগুলো বন্দীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে।
১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল, রাজশাহী কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ডে অনেক বন্দী শান্তিপূর্ণ অনশন ধর্মঘটে অংশ নেন। জেলারের নির্দেশে কারারক্ষীরা নিরস্ত্র বন্দীদের ওপর গুলি চালায়। এতে সাতজন কমিউনিস্ট নেতা নিহত হন এবং প্রায় ৩০ জন আহত হন। শহীদরা হলেন:
১. কমরেড সুখেন্দু ভট্টাচার্য
২. কমরেড সুধীন ধর
৩. কমরেড হানিফ শেখ
৪. কমরেড দেলোয়ার হোসেন
৫. কমরেড বিজন সেন
৬. কমরেড বলরাম সিংহ
৭. কমরেড আনোয়ার হোসেন
এটি ভারতীয় উপমহাদেশে কারাগারের ভেতরে সংঘটিত প্রথম দিকের বড় রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। এই হত্যাকাণ্ডটি তৎকালীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের নির্মমতা এবং কৃষক, শ্রমিক ও ছাত্রদের সংগ্রামের ঐক্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। এটি বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পূর্বসূরি হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং কমরেড মণি সিংহ পরবর্তীতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং শহীদদের স্মরণে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়।
আজ খাপড়া ওয়ার্ড দিবসে আমরা এক কণ্ঠে, এক চেতনায় একত্রিত হয়ে ১৯৫০ সালে রাজশাহী কারাগারের ভেতরে আত্মত্যাগ করা সেই শহীদদের স্মরণ, শ্রদ্ধা এবং সম্মান জানাই। তারা ছিলেন তরুণ, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং নিরস্ত্র—তবুও তারা ন্যায়, মর্যাদা এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক দেশের স্বপ্নের জন্য অটল ছিলেন। তাদের সাহস ছিল সেই গুলির চেয়েও শক্তিশালী, যা তাদের নীরব করতে চেয়েছিল। এই শহীদরা কেবল ইতিহাসের অংশ নন; তারা আমাদের নৈতিক উত্তরাধিকার।


কলামিস্ট ডাঃ আজিজ, লংআইল‍্যান্ড , নিউইয়র্ক।