অস্তিত্ব রক্ষায় কৌশল অবলম্বন— রফিকুল ইসলাম ভুলু
প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক:
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহে ইচ্ছা করলে জননেত্রী শেখ হাসিনা রক্তপাত ঘটিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখতে পারতেন। কিন্তু মানবিক বিবেচনা থেকে তিনি সেই পথ অবলম্বন করেননি।
পরবর্তীতে সামরিক বাহিনীর কিছু হঠকারী অবস্থান এবং স্বাধীনতাবিরোধী মৌলবাদী জঙ্গিগোষ্ঠীর সহিংসতা, হত্যাযজ্ঞ ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সরকার পতনের পরিস্থিতি তৈরি হয়। ঘটনাচক্রে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা, এমপি ও মন্ত্রী সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারায় এবং অনেকে বিদেশে আশ্রয় নেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
এই অবস্থায় ড. ইউনুসকে ঘিরে স্বাধীনতাবিরোধী চক্র ও আওয়ামী লীগবিরোধী শক্তি সুযোগ নিয়ে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণার মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এর ফলে তৃণমূল পর্যায়ে বহু নেতা–কর্মী মব সন্ত্রাসের শিকার হন, নির্যাতন, হত্যা এবং জ্বালাও-পোড়াওয়ের ঘটনাও ঘটে।
১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর যেমন দলীয় নেতৃবৃন্দের কাছ থেকে কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা পাওয়া যায়নি এবং নেতৃত্ব কার্যত অনুপস্থিত ছিল—২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরও অনেকটা সেই ধরনের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি দেখা গেছে। নেতৃত্বের শূন্যতা এবং অস্থির পরিস্থিতির কারণে সংগঠিত প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে মানবতার দৃষ্টিকোণ থেকে রক্তপাত এড়িয়ে দেশের স্বার্থে সহিংসতার পথ পরিহার করায় বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাকে মানবতার প্রতীক হিসেবেই অনেকেই দেখেন। একই সঙ্গে দলীয় হাইব্রিড নেতৃত্ব, দুর্নীতি ও ক্ষমতালোভী কিছু গোষ্ঠীর সিদ্ধান্তহীনতার কারণে সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি বলেও অনেকে মনে করেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশ ও জাতিকে ধ্বংসের ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করার জন্য স্বাধীনতার স্বপক্ষের সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানো জরুরি। দলমত নির্বিশেষে সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগে একটি বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা সময়ের দাবি।
এই ঐক্যের ভিত্তি হতে পারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ এবং ১৯৭২ সালের সংবিধানের চার মূলনীতি—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। পাশাপাশি ভাষা আন্দোলনের চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা, ভাষা শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগ, ত্রিশ লক্ষ শহীদের আত্মদান এবং দুই লক্ষাধিক মা-বোনের আত্মত্যাগকে ধারণ করেই এগিয়ে যেতে হবে।
রাজনীতিকে হতে হবে চর্চাভিত্তিক, সেবামূলক ও কল্যাণমুখী। দলের নামে চাঁদাবাজি, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, ঘুষ, দুর্নীতি, সহিংসতা বা অন্যায়ের কোনো স্থান থাকতে পারে না। প্রকৃত বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক হিসেবে নৈতিকতা, সততা ও ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করাই হওয়া উচিত সবার অঙ্গীকার।
বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধানকে সমুন্নত রেখে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই প্রয়োজনে সংস্কার বা সংশোধনের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী জাতীয় সরকার গঠনের বিষয়টিও আলোচনায় আসতে পারে। এটি “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ জাতীয় সরকার” অথবা “জনতার সরকার” নামে পরিচিত হতে পারে—যার মূল লক্ষ্য হবে দেশের সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করা।
দেশের বর্তমান সংকটময় সময়ে ঐক্য, আদর্শ ও নৈতিকতার ভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়াই হতে পারে আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার প্রধান কৌশল।


















