Logo

আন্তর্জাতিক    >>   বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতির একটি পর্যালোচনা: গণঅভ্যুত্থান, নির্বাচন ও ভবিষ্যৎ রাজনীতির সম্ভাবনা

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতির একটি পর্যালোচনা: গণঅভ্যুত্থান, নির্বাচন ও ভবিষ্যৎ রাজনীতির সম্ভাবনা

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতির একটি পর্যালোচনা: গণঅভ্যুত্থান, নির্বাচন ও ভবিষ্যৎ রাজনীতির সম্ভাবনা

জাকির হোসেন বাচ্চু:
অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বিকাশের অন্যতম মৌলিক শর্ত। নাগরিকদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগই গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি। নির্দিষ্ট সময় পরপর জনগণের ভোটের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের পথ উন্মুক্ত না থাকলে রাষ্ট্রে কর্তৃত্ববাদী শাসনের ঝুঁকি তৈরি হয়। তখন রাজনৈতিক জবাবদিহিতা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং রাষ্ট্রযন্ত্র ধীরে ধীরে জনগণের ওপর অন্যায় প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে।
২০০৮ সালের পর দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদলকে ঘিরে নানা অনিয়ম ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়। সেই প্রেক্ষাপটে জনঅসন্তোষ ক্রমশ তীব্র হয়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে একটি সরকার উৎখাত হয়। পরবর্তীতে প্রায় সতের মাস অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় থাকার পর ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
এই নির্বাচনকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, অন্যদিকে সেই গণতন্ত্রকে সুসংহত করার চ্যালেঞ্জ সামনে এসেছে। এই দুই দায়িত্ব কীভাবে সম্পন্ন হবে—সেই প্রশ্নে একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমিও কিছুটা উদ্বিগ্ন।
মনে রাখতে হবে, এবারের নির্বাচন ছিল সরাসরি একটি গণঅভ্যুত্থানের ফল। সেই অভ্যুত্থানে যারা জীবন দিয়েছেন, নতুন সরকারের কাছে তাদের প্রতি এক নৈতিক দায় রয়েছে। সেই দায় পূরণ করতে হলে শুধু ক্ষমতা পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়—রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার এবং বৈষম্যমুক্ত একটি গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে হবে।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশকে গণতন্ত্রে ফেরার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ এনে দিয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। নির্বাচনের দিন কিছু বিচ্ছিন্ন অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও সামগ্রিকভাবে নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে বলা যায়। তবে শুধু অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনই যথেষ্ট নয়—নির্বাচনকে হতে হয় অংশগ্রহণমূলকও।
এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মতো একটি বড় রাজনৈতিক দল ভোটের মাঠে না থাকলেও ভোটার উপস্থিতি প্রায় ৬০ শতাংশের কাছাকাছি ছিল। তবে কিছু জায়গায় অপ্রত্যাশিত সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে। গোপালগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ ও কুমিল্লায় ভোটকেন্দ্রে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। কোথাও কোথাও জাল ভোট, ব্যালটে সিল মারা কিংবা টাকা বিতরণের অভিযোগও উঠেছে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে নির্বাচন কমিশনের যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
এবারের নির্বাচনে ভোটারদের সামনে গণভোটের মতো একটি প্রশ্নও ছিল—‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’। ফলাফলে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হয়েছে। এর ফলে জুলাই সনদে প্রস্তাবিত রাষ্ট্র সংস্কারের নানা উদ্যোগ বাস্তবায়নের একটি সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে। উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা, আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের বিধান এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পদ্ধতির সংস্কারের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
তবে এই প্রক্রিয়া নিয়ে কিছু বিতর্কও রয়েছে। কারণ ১৯৭২ সালের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত মুক্তিযুদ্ধের চার মূলনীতি বাদ দেওয়ার প্রশ্নটি সামনে এসেছে। এই কারণে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)সহ কয়েকটি বামপন্থী রাজনৈতিক দল সেই সনদে স্বাক্ষর করেনি।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি সর্বজনীন জনযুদ্ধ। দেশের সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ, আত্মত্যাগ এবং ঐক্যের মধ্য দিয়েই সেই সংগ্রাম বিজয়ে পৌঁছেছিল। জনগণের স্বপ্ন ছিল একটি গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক এবং সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা। তাই মুক্তিযুদ্ধের এই মৌলিক চেতনাকে উপেক্ষা করে নতুন রাজনৈতিক বয়ান দাঁড় করানোর যে চেষ্টা দেখা যাচ্ছে, তা অনেকের কাছে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
এবারের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ২১৩টি আসন এবং জামায়াত জোট ৭৭টি আসন লাভ করেছে। জামায়াত প্রায় ৩১ শতাংশ ভোট পেয়েছে। একাত্তরের গণহত্যার ইতিহাসের কারণে দীর্ঘদিন এই দলটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিতর্কিত ছিল। এবারের নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের একটি বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।
তবে নির্বাচনের ফলাফল দেখিয়ে দিয়েছে—বাংলাদেশের জনগণের একটি বড় অংশ এখনও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে অস্বীকার করে এমন রাজনৈতিক বয়ান গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়। বিশেষ করে নারীদের কর্মঘণ্টা কমিয়ে দেওয়া বা নারীদের ঘরে সীমাবদ্ধ রাখার মতো প্রস্তাব সমাজে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। এর ফলে অনেক কর্মজীবী নারী ভোটের মাধ্যমে তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এতে স্পষ্ট হয়েছে যে নারীরা শুধু নিরাপত্তা নয়, সমান অধিকার, মর্যাদা এবং স্বাধীনতার দাবিও রাখেন।
নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভা দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। তবে সরকার গঠনের শুরুতেই সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণের প্রশ্নে একটি রাজনৈতিক জটিলতা তৈরি হয়েছে। সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে এ ধরনের শপথের উল্লেখ না থাকায় বিএনপি এতে স্বাক্ষর করেনি। এর প্রতিক্রিয়ায় জামায়াত ও এসসিপির কিছু সংসদ সদস্য মন্ত্রীসভার শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নেননি। বিষয়টি রাজনৈতিক দূরত্বের একটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
সংবিধান বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, একটি প্রজন্ম পরবর্তী প্রজন্মকে সাংবিধানিকভাবে সম্পূর্ণভাবে বেঁধে রাখতে পারে না। সংসদ সংবিধান সংশোধন করতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যৎ সংসদের ওপর বাধ্যবাধকতা আরোপ করা গণতান্ত্রিক চেতনার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অন্যদিকে আরেকটি মত হলো—রাষ্ট্র পরিচালনায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর নির্বাহী কাঠামো প্রয়োজন।
এই বিতর্কগুলোই প্রমাণ করে যে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি ঐকমত্যের সংস্কৃতি তৈরি করা জরুরি। অন্যথায় গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে তা ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
বিএনপি যদি তাদের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর জনগণের এই বার্তাটি উপলব্ধি করে একটি সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারে, তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতি ইতিবাচক পথে এগিয়ে যেতে পারে। অন্যথায় অতীত অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে—একক রাজনৈতিক আধিপত্য দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে না; বরং বিভাজনকে আরও তীব্র করে তোলে।
এদিকে বামপন্থী রাজনীতির ক্ষেত্রেও এবারের নির্বাচনের ফলাফল একটি বড় শিক্ষা হয়ে এসেছে। রাজনৈতিক কৌশল যতই সুপরিকল্পিত হোক না কেন, জনগণের আস্থা অর্জন না করলে তা সফল হয় না। বাস্তবতা হলো—সিপিবি এবং অন্যান্য বামপন্থী দলের সাংগঠনিক দুর্বলতা, অভ্যন্তরীণ বিভক্তি এবং গণসংগঠনগুলোর বিচ্ছিন্নতা তাদের রাজনৈতিক শক্তিকে দুর্বল করেছে।
ছাত্র ইউনিয়ন, শ্রমিক সংগঠন, সাংস্কৃতিক সংগঠন—অনেক ক্ষেত্রেই বিভক্তির বাস্তবতা রয়েছে। শক্তিশালী গণআন্দোলনের ধারাবাহিকতা তৈরি করতে না পারা বাম রাজনীতির একটি বড় সীমাবদ্ধতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সিপিবির চূড়ান্ত লক্ষ্য সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা—এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথ অবশ্যই দীর্ঘ। তবে একটি শক্তিশালী, সুশৃঙ্খল ও জনগণের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত রাজনৈতিক সংগঠন ছাড়া সেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। তাই বামপন্থী দলগুলোর সামনে প্রধান দায়িত্ব হলো শ্রমজীবী ও মেহনতি মানুষের বাস্তব সমস্যার পাশে দাঁড়িয়ে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জনগণের আস্থা অর্জন করা।
সর্বোপরি বলা যায়—বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি একই সঙ্গে সম্ভাবনা ও ঝুঁকি বহন করছে। গণতন্ত্র পুনর্গঠনের এই সময়টি যদি দায়িত্বশীল নেতৃত্ব, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং জনগণের স্বার্থকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়, তবে দেশ একটি ইতিবাচক ভবিষ্যতের দিকে এগোতে পারবে।
অন্যথায় এই সুযোগও হারিয়ে যেতে পারে।
জাকির হোসেন বাচ্চু, সাধারণ সম্পাদক, প্রগ্রেসিভ ফোরাম ইউএসএ