Logo

আন্তর্জাতিক    >>   পিলখানা ট্র্যাজেডি নিয়ে অপপ্রচার ও রাজনৈতিক বিতর্ক

পিলখানা ট্র্যাজেডি নিয়ে অপপ্রচার ও রাজনৈতিক বিতর্ক

পিলখানা ট্র্যাজেডি নিয়ে অপপ্রচার ও রাজনৈতিক বিতর্ক

নয়ন বিশ্বাস রকি :
২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পিলখানা-তে সংঘটিত বিডিআর বিদ্রোহ বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম মর্মান্তিক অধ্যায়। এই ঘটনায় বহু সেনা কর্মকর্তা নির্মমভাবে নিহত হন, যার মধ্যে তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদও ছিলেন। হত্যাকাণ্ডের নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতা জাতিকে গভীরভাবে শোকাহত করে এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার ভেতরে-বাইরে ব্যাপক আলোড়ন তোলে।
একটি মহল দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, এই হত্যাকাণ্ড ছিল একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র—যার উদ্দেশ্য ছিল সেনাবাহিনীকে দুর্বল করা। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সেনা কর্মকর্তাদের হত্যা করে বাহিনীর মনোবল ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে পাল্টা যুক্তি হিসেবে বলা হয়, হাজার হাজার কর্মকর্তার একটি সুসংগঠিত বাহিনীতে ৫৭ জন কর্মকর্তাকে হত্যা করে পুরো সেনাবাহিনীকে দুর্বল করে দেওয়া সম্ভব—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। বরং এই ট্র্যাজেডিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে বলেও অভিযোগ ওঠে।
ঘটনার আরেকটি দিক জাতিকে আরও বেশি ব্যথিত করে—নারী ও কিশোরীসহ নিরস্ত্র ব্যক্তিদের ওপর নৃশংস নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উঠে আসে, কীভাবে মহাপরিচালকের বাসভবনে হামলা, গুলি, লাঞ্ছনা ও হত্যার ঘটনা সংঘটিত হয়। এসব বিবরণ কেবল একটি সামরিক বিদ্রোহ নয়, বরং এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরে।
ঘটনার পর সরকার তিন পর্যায়ে তদন্ত সম্পন্ন করে—বাহিনীর অভ্যন্তরীণ তদন্ত, সেনাবাহিনীর তদন্ত এবং জাতীয় তদন্ত। বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রশ্নাতীত করতে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের অধীনে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে রেফার করা হয় এবং জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। বিচার কোন আইনে হবে—সেনা আইনে নাকি প্রচলিত ফৌজদারি আইনে—তা নিয়ে সে সময় আইনজীবীদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ে পরিচিত আইনজীবীদের বক্তব্যও পরবর্তীতে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হয়।
পরবর্তীকালে সরকার পরিবর্তনের পর কিছু দণ্ডপ্রাপ্ত বা অভিযুক্ত ব্যক্তির মুক্তি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। সমালোচকরা অভিযোগ করেন, এতে বিচারপ্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন সামনে আসে। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট মহল দাবি করে, আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পিলখানা ট্র্যাজেডি কেবল একটি বিদ্রোহ বা হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্র, সেনাবাহিনী এবং রাজনীতির ইতিহাসে গভীর ক্ষতচিহ্ন হয়ে আছে। এই ঘটনাকে ঘিরে অপপ্রচার, পাল্টা অভিযোগ ও রাজনৈতিক অবস্থান—সবকিছু মিলিয়ে বিষয়টি আজও সংবেদনশীল। তবে ইতিহাসের এই বেদনাদায়ক অধ্যায় থেকে শিক্ষা নিয়ে জাতীয় ঐক্য, স্বচ্ছ বিচার ও সত্য অনুসন্ধানের পথেই অগ্রসর হওয়াই সময়ের দাবি।
নয়ন বিশ্বাস রকি , সাবেক ছাত্রনেতা ও সমাজ সেবক।