Logo

আন্তর্জাতিক    >>   বঙ্গবন্ধু: একটি জাতির জন্মদাতা ও আপসহীন সংগ্রামের এক জীবন্ত মহাকাব্য

বঙ্গবন্ধু: একটি জাতির জন্মদাতা ও আপসহীন সংগ্রামের এক জীবন্ত মহাকাব্য

বঙ্গবন্ধু: একটি জাতির জন্মদাতা ও আপসহীন সংগ্রামের এক জীবন্ত মহাকাব্য

মানিক লাল ঘোষ:
বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম অর্জন হলো স্বাধীন বাংলাদেশ। আর এই অর্জনের সমার্থক নাম—বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় যে শিশুর জন্ম হয়েছিল, কালের পরিক্রমায় তিনিই হয়ে উঠেছিলেন পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ একটি জাতির আশার আলোকবর্তিকা। টুঙ্গিপাড়ার সেই ‘খোকা’ থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’ এবং পরবর্তীতে ‘জাতির পিতা’ হয়ে ওঠার পথটি ছিল ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল এবং আপসহীন সংগ্রামের এক জীবন্ত মহাকাব্য।
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন কেবল একটি দলের নেতৃত্বে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা ছিল একটি শোষিত জাতির অধিকার আদায়ের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৮ সালের আইয়ুববিরোধী আন্দোলন এবং ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলন—প্রতিটি ধাপে তিনি ছিলেন সামনের সারির অকুতোভয় সৈনিক। বিশেষ করে ১৯৬৬ সালের ছয় দফা ছিল বাঙালির ‘ম্যাগনা কার্টা’ বা মুক্তির সনদ, যার মধ্য দিয়েই তিনি স্বাধীনতার বীজ বপন করেছিলেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ফাঁসির মুখোমুখি হয়েও তিনি আপস করেননি; বরং রাজপথের আন্দোলনের মুখে মুক্তি পেয়ে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত হন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ৪,৬৮২ দিনের কারাবরণ প্রমাণ করে যে বাঙালির মুক্তির জন্য তিনি নিজের যৌবনকে উৎসর্গ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি। তাঁর লেখা অসমাপ্ত আত্মজীবনী ও কারাগারের রোজনামচা কেবল বই নয়, বরং একটি শোষিত জাতির সংগ্রামের জীবন্ত দলিল।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ ছিল মূলত একটি নিরস্ত্র জাতিকে সশস্ত্র সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করার জাদুকরী আহ্বান। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ভাষণগুলোর অন্যতম এই ১৮ মিনিটের বজ্রকণ্ঠ উচ্চারণই ছিল বাঙালির অলিখিত স্বাধীনতার ঘোষণা। ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে গ্রেপ্তার হওয়ার পূর্বমুহূর্তে তাঁর আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতার ঘোষণা দেশবাসীকে মরণপণ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার চূড়ান্ত শক্তি জুগিয়েছিল। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর বিশ্ব মানচিত্রে উদিত হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের রাজনীতির এক ট্র্যাজিক বাস্তবতা হলো—যখনই আওয়ামী লীগ ক্ষমতার বাইরে থাকে, তখনই রাষ্ট্রীয়ভাবে ইতিহাস বিকৃতির এক সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র শুরু হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর দীর্ঘ ২১ বছর ধরে যে অন্ধকার অধ্যায় চলেছিল, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশ যেন আবারও সেই একই বৃত্তে আবর্তিত হচ্ছে।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দীর্ঘ দুই দশক ধরে পাঠ্যবই থেকে তাঁর নাম মুছে ফেলা হয়, ৭ মার্চের ভাষণ নিষিদ্ধ করা হয় এবং ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে নির্বাসনে পাঠিয়ে পাকিস্তানি ভাবধারার সাম্প্রদায়িক রাজনীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়। ইতিহাসের ধ্রুব সত্যকে অস্বীকার করে কৃত্রিমভাবে ‘বিকল্প নায়ক’ দাঁড় করানোর সেই অপচেষ্টা আজও জাতির কপালে কলঙ্ক হয়ে রয়েছে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের দোহাই দিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি ও আদর্শকে মুছে ফেলার এক উদ্বেগজনক প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অনেক সিদ্ধান্তই ইতিহাসবিমুখতার পরিচয় বহন করছে বলে সমালোচনা রয়েছে।
জাতীয় শোক দিবসের সরকারি ছুটি বাতিল, ১৫ আগস্টে রাষ্ট্রীয়ভাবে শ্রদ্ধা নিবেদন বন্ধ করা, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক স্মৃতি জাদুঘর পুড়িয়ে দেওয়া এবং পরবর্তীতে সেটি ভেঙে ফেলার ঘটনা—এসবই বাঙালির ইতিহাসের শিকড় উপড়ে ফেলার অপচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে, ২০২৬ সালের ৭ মার্চেও ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকা কার্যত অবরুদ্ধ ছিল। ঐতিহাসিক এই দিনে জাতির পিতার স্মৃতিবিজড়িত স্থানে ফুল দিতে যাওয়া সাধারণ মানুষ ও নেতা-কর্মীদের বাধা প্রদান, এমনকি গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে একটি বিশেষ গোষ্ঠী এখনও বঙ্গবন্ধুকে এ দেশের ইতিহাস ও মানচিত্র থেকে মুছে ফেলতে মরিয়া।
কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরা একটি চিরন্তন সত্য বারবার ভুলে যায়—ব্যক্তি মুজিবকে হত্যা করা সম্ভব, কিন্তু বাঙালির হৃদয়ে খোদাই করা তাঁর নাম মুছে ফেলা অসম্ভব। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সত্যকে সাময়িকভাবে চাপা দেওয়া গেলেও তা কখনো স্থায়ীভাবে স্তব্ধ করা যায় না। ইউনেস্কো স্বীকৃত ৭ মার্চের ভাষণ আজ আর কোনো সরকারি গেজেট বা আদেশের মুখাপেক্ষী নয়; এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের স্পন্দন।
ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলেই যারা ইতিহাস বিকৃতির মাধ্যমে রাজনৈতিক সুবিধা নিতে চায়, তারা শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের আস্তাকুঁড়েই নিক্ষিপ্ত হয়। যাঁকে কেন্দ্র করে একটি রাষ্ট্রের জন্ম, তাঁকে অস্বীকার করা মানেই সেই রাষ্ট্রের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করা। যতদিন মানচিত্রে বাংলাদেশ থাকবে, যতদিন পদ্মা-মেঘনা-যমুনা প্রবাহিত হবে, ততদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির হৃদয়ে থাকবেন—অবিনাশী, অম্লান ও চিরভাস্বর। বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ আজ অভিন্ন সত্তা; একে বিচ্ছিন্ন করার শক্তি পৃথিবীর কোনো ষড়যন্ত্রকারীর নেই।


মানিক লাল ঘোষ 
সাংবাদিক ও কলামিস্ট; ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি ।