ক্ষমতা সাময়িক, দায়িত্ব চিরস্থায়ী: নবনির্বাচিত মন্ত্রী-এমপিদের প্রতি এক খোলা চিঠি
উত্তম কুমার সাহা:
এখন আপনি মন্ত্রী। আপনি এমপি। আপনার গাড়ির সামনে পতাকা, চারপাশে নিরাপত্তা, দরজায় দরজায় অভ্যর্থনা। কিন্তু ভুলে যাবেন না—গতকাল আপনি কে ছিলেন ? আপনি ছিলেন সাধারণ মানুষের মতোই একজন নাগরিক; ভোটের লাইনে দাঁড়ানো, স্বপ্ন দেখা, প্রতিশ্রুতির উপর ভরসা করা একজন মানুষ।
ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। পাঁচ বছর পর এই মন্ত্রিত্ব, এই পদ, এই প্রটোকল—কিছুই নাও থাকতে পারে। তখন আপনার পাশে থাকবে শুধু আপনার কাজ, আপনার চরিত্র, আপনার সততা।
আজ যারা আপনাকে অভিনন্দন জানাচ্ছে, তারাই কাল আপনার জবাব চাইবে। কারণ গণতন্ত্রে চেয়ার বড় নয়—দায়িত্ব বড়। পদমর্যাদা বড় নয়—আস্থা বড়।
এই নির্বাচনের মাধ্যমে মানুষ আপনাকে যে ম্যান্ডেট দিয়েছে, তা কোনো ব্যক্তিগত গৌরবের সনদ নয়; এটি একটি অর্পিত আমানত। এই আমানতের নাম জনগণের বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস ভাঙার অধিকার আপনার নেই।
মিথ্যা কথা বলবেন না।
মিথ্যা আশ্বাস দেবেন না।
মিথ্যা অপবাদ, অপপ্রচার, বিভাজনের রাজনীতি—এসব বন্ধ করুন।
ক্ষমতা ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে দমন নয়, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করুন। রাষ্ট্রের সম্পদ ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার নয়; এটি জনগণের ঘাম-রক্তে গড়া সম্পদ। মনে রাখবেন, প্রতিটি টাকার হিসাব একদিন দিতে হবে—ইতিহাসের কাছে, মানুষের কাছে, নিজের বিবেকের কাছে।
আপনার চারপাশে অনেকেই তোষামোদ করবে। বলবে—“স্যার, আপনি যা করছেন সবই ঠিক।” কিন্তু সত্যিকারের নেতা সেই, যিনি সমালোচনা শোনেন, ভুল স্বীকার করেন, এবং সংশোধন করেন। অহংকার ক্ষমতার সবচেয়ে বড় শত্রু। বিনয়ই নেতৃত্বের আসল শক্তি।
একজন ভালো মানুষ হওয়ার চেষ্টা করুন। ভালো মন্ত্রী হওয়ার আগে ভালো মানুষ হওয়া জরুরি। মানুষের ঘরে ঘরে যে প্রত্যাশার আলো জ্বলছে, তা নিভিয়ে দেবেন না। চাকরি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা—এই মৌলিক প্রশ্নগুলোকে অগ্রাধিকার দিন। ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা নয়, জাতীয় অগ্রগতি হোক আপনার একমাত্র লক্ষ্য।
মনে রাখবেন, ইতিহাস খুব নির্মম বিচারক। পাঁচ বছর পর মানুষ হয়তো আপনার নাম স্মরণ করবে—কিন্তু কীভাবে? একজন সৎ ও কর্মঠ জননেতা হিসেবে, নাকি ক্ষমতার অপব্যবহারকারী হিসেবে? এই সিদ্ধান্ত আজ আপনার হাতে।
আপনি মন্ত্রী হয়েছেন—এটি আপনার সাফল্য।
কিন্তু মানুষের সেবা করতে পারলে—সেটিই হবে আপনার মর্যাদা।
তাই বলি, পদ নয়—কাজকে বড় করুন।
ক্ষমতা নয়—মানবিকতাকে শক্ত করুন।
প্রতিশ্রুতি নয়—বাস্তবায়নকে প্রাধান্য দিন।
কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষ শুধু একটি প্রশ্নই করবে—
আপনি ক্ষমতায় গিয়ে কেমন মানুষ হয়ে উঠেছিলেন?


















