ধর্ম নয়, উন্নয়ন ও গণতন্ত্র হোক রাজনীতির মূল ভিত্তি: প্রয়োজন নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির —সম্প্রীতি, মানবিকতা ও জনকল্যাণের রাজনীতিই পারে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে
কল্লোল দাশ:
রাজনীতি একটি দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। রাজনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন। কিন্তু যখন রাজনীতিতে ধর্মকে ব্যবহার করে বিভাজন সৃষ্টি করা হয়, তখন রাজনীতির প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়।
বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনার ভিত্তিতে জন্ম নেওয়া দেশ। মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল আদর্শ ছিল—মানবিক মর্যাদা, সাম্য, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও মূল্যবোধের বিষয়; এটি কখনো রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হওয়া উচিত নয়।
বর্তমান বিশ্বে যেসব দেশ উন্নতির শিখরে পৌঁছেছে, তারা বিজ্ঞান, শিক্ষা, প্রযুক্তি, সুশাসন ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দিয়েছে। ধর্মীয় বিভাজন বা ঘৃণার রাজনীতি কোনো জাতিকে স্থায়ী উন্নতির পথে নিয়ে যেতে পারে না। বরং এটি সমাজে অবিশ্বাস, সংঘাত ও বিভক্তি তৈরি করে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন সময় এসেছে একটি বড় পরিবর্তনের। প্রয়োজন এমন রাজনৈতিক নেতৃত্ব, যারা ক্ষমতার চেয়ে জনগণের কল্যাণকে প্রাধান্য দেবেন। যারা তরুণদের কর্মসংস্থান, কৃষকের ন্যায্য অধিকার, শ্রমজীবী মানুষের নিরাপত্তা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে রাজনীতির প্রধান বিষয় হিসেবে তুলে ধরবেন।
ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই ধর্মের অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে। কোনো ধর্মই ঘৃণা, সহিংসতা বা বৈষম্যের শিক্ষা দেয় না। তাই ধর্মকে নিয়ে বিভাজনের রাজনীতি নয়, বরং সব ধর্ম ও মতের মানুষের সহাবস্থানের পরিবেশ তৈরি করাই হওয়া উচিত একটি আধুনিক রাষ্ট্রের লক্ষ্য।
রাজনীতিতে পরিবর্তন শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তনের মাধ্যমে সম্ভব নয়; প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের ভেতরে গণতান্ত্রিক চর্চা বাড়াতে হবে। যোগ্য, সৎ ও দেশপ্রেমিক নেতৃত্বকে সামনে আনতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
একটি দেশের শক্তি তার জনগণ। জনগণের ঐক্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতাই পারে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে তুলতে। তাই বিভেদের রাজনীতি পরিহার করে ঐক্য, উন্নয়ন ও মানবিক মূল্যবোধের রাজনীতির দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমরা কেমন রাজনীতি চাই তার ওপর। আমরা কি বিভাজনের রাজনীতি চাই, নাকি উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণের রাজনীতি চাই—এই সিদ্ধান্ত নিতে হবে এখনই।
সময় এসেছে এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির, যেখানে ধর্ম নয়, মানুষ হবে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। যেখানে ক্ষমতা নয়, সেবা হবে নেতৃত্বের প্রধান পরিচয়। একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে এই পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি।
কল্লোল দাশ,
সাধারণ সম্পাদক, উদীচী যুক্তরাষ্ট্র সংসদ ।



















