আওয়ামী লীগ হচ্ছে সেই ফিনিক্স পাখি, যার ছাই থেকেও পুনর্জন্ম নেয়ার ইতিহাস রয়েছে
সাজ্জাদ হোসেন সবুজ:
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন ও বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে যে বিতর্কিত অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল সেটিকে আইনে পরিণত করার উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি সরকার।
এলক্ষ্যে সেই অধ্যাদেশটিকে সংশোধিত আকারে সংসদে পাশের জন্য সুপারিশ করেছে বর্তমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ কর্তৃক গঠিত বিশেষ কমিটি।
কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী অধ্যাদেশটি সংসদে আইন আকারে পাশ হলে এরপর আওয়ামী লীগের যেকোনো কার্যক্রম শুধু নিষিদ্ধই নয়, বরং দলটির সব নেতাকর্মীদেরও বিচারের আওতায় আনা যাবে।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এই উদ্যোগের তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এ ব্যাপারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের ১২ই মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সব সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল।
এ বিষয়ে তখন জারি করা প্রজ্ঞাপনের শেষাংশে তখন বলা হয়েছিল, ".... সরকার যুক্তিসংগতভাবে মনে করে সন্ত্রাস বিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং সন্ত্রাস বিরোধী আইন, ২০০৯ এর ধারা-১৮(১) এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং এর সকল অঙ্গসংগঠন, সহযোগী সংগঠন ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বিচারকার্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দলটি এবং এর সকল অঙ্গসংগঠন, সহযোগী সংগঠন ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা সমীচীন;
বরেণ্য অর্থনীতিবিদ প্রফেসর রেহমান সোবহান বলছেন, দেশের দ্বিদলীয় রাজনীতির দুটি স্তম্ভের একটি আওয়ামী লীগ। প্রায় আট দশকের ইতিহাস ধারণ করা রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগ এবং তাদের উল্লেখযোগ্য ভোটব্যাংক রয়েছে। নিষিদ্ধ করলেই রাজনীতি থেকে আওয়ামী শক্তি হঠাৎ করে বিলীন হয়ে যাবে—এমনটি ভাবার সুযোগ নেই। বিষয়টির সুরাহা সরকারকেই করতে হবে। আর সেটি করতে ব্যর্থ হলে আমাদের ‘সংস্কারকৃত’ রাজনৈতিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বের সাবেক সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের পেছনে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী গোষ্ঠীর চাপ ছিলো ইঙ্গিত করে রেহমান সোবহান বলেন, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি, যারা দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই উপস্থিত রয়েছে, তারা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানে সুযোগ নিয়েছে, এর ভেতরে ঢুকে পড়েছে এবং অভ্যুত্থানের গতিমুখ নির্ধারণের ক্ষেত্রেও তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এর একটি অংশের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর দল আওয়ামী লীগের প্রতি প্রবল বিরূপ মনোভাব বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বিরূপ মনোভাবে রূপান্তরিত হয়েছিল।
প্রফেসর রেহমান সোবহান মনে করেন, শেখ হাসিনার কঠোর অবস্থানের পেছনেও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। তিনি বলেন, "১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত যেসব সরকার ক্ষমতায় ছিল, তারা রাষ্ট্রীয় পরিসর থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগের ভূমিকা প্রায় সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলেছিল। এই ইতিহাস মুছে দেওয়ার প্রবণতার প্রতিক্রিয়াতেই শেখ হাসিনার অবস্থান কঠোর হয়ে ওঠে।"
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জোবাইদা নাসরীন তার প্রতিক্রিয়ায় বিবিসিকে বলেন রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা ঐতিহাসিকভাবেই কখনো কারও জন্য সুফল বয়ে আনেনি, বরং যারা করেছে তাদের ঐতিহাসিক দায় নিতে হয়েছে।
তিনি বলেন, "এদেশে আওয়ামী লীগের অনেক ভোটার ও সমর্থক আছে। মানুষ দলটিকে গ্রহণ করবে কি-না সেটি যাচাই করার সুযোগ অন্তর্বর্তী সরকার নষ্ট করেছে। কোনো অর্থেই রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম বন্ধ করা বা দল নিষিদ্ধ করা কাউকে সাময়িক তৃপ্তি কিংবা প্রতিহিংসা মেটানোর স্বাদ দিতে পারে কিন্তু চূড়ান্ত বিচারে দেশ ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এটি মোটেও ভালো পদক্ষেপ নয়”।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আইন করে একটি দলকে নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে অপরাধ থাকলে আদালতে বিচার কিংবা ভোটের মাধ্যমে জনগণকে দলটিকে প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ দিলে এ নিয়ে প্রতিহিংসার অভিযোগ ওঠার সুযোগ থাকতো না।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী নিজাম উদ্দিন বলেছেন আওয়ামী লীগ একটি প্রাচীন রাজনৈতিক দল, সে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছে। এখানে আমি মনে করব পার্লামেন্টে অনেক সুধী ও বিজ্ঞজন আছেন, তাঁরা বিষয়টি দেখবেন। বিশেষ করে আইনমন্ত্রীকে আমি যতটুকু জানি তিনি অনেক পড়াশোনা জানা মানুষ, তিনি বিষয়টি ভেবে দেখবেন।
তিনি বলেন,”আওয়ামী লীগকে যদি সংসদে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব করা হয়, আমি মনে করব এটি ২১শে আগস্ট, ১৫ই আগস্ট বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে ক্ষত সৃষ্টি করেছিল, এটি আরেকটি ক্ষত সৃষ্টি করবে।”
নিজাম উদ্দিন বলেন যারা অতীতে নিষিদ্ধ হয়েছিল তারা এই ভয় থেকে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করতে চায়। কারণ তাদের একটা আশঙ্কা আছে আওয়ামী লীগ যদি কখনো ফিরে আসে তবে তারা তাদের আবার নিষিদ্ধ করবে। তারা চায় আওয়ামী লীগকে বিএনপি যদি নিষিদ্ধ করে তবে ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগ এসে একই পন্থা নিলে তাদের সুবিধা হবে—যারা অতীতে নিষিদ্ধ হয়েছিল।
আমরা মীর জাফরের কথা শুনেছি, মীর জাফরের কিন্তু তখন কোনো বিচার হয়নি, কিন্তু ইতিহাস তাকে কী হিসেবে চিনে? গালির সমার্থক হিসেবে চিনে। আজকে যারা এ কার্যক্রমের সাথে জড়িত আছেন আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার বিষয়ে, ইতিহাস তাদের একদিন কঠিন বিচার করবে।
নিজাম উদ্দিন বলেন যে দলের নেতৃত্বে ও অসংখ্য নেতাকর্মীর ত্যাগে এ দেশ স্বাধীন হয়েছে, সে দলকে এভাবে নিষিদ্ধ করার প্রশ্নই আসতে পারে না। আওয়ামী লীগের কোন নেতা কর্মী যদি কোথাও কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে থাকে তবে সেটির বিচার হতে পারে উপযুক্ত আদালত কর্তৃক।
আওয়ামী লীগ অবশ্যই ফিরবে, সেটা দেশ ও জনগণের প্রয়োজনে এবং মানুষের প্রয়োজনে আওয়ামী লীগ আবার ফিরবে। আওয়ামী লীগকে প্রতিরোধ করার বা রুখার শক্তি আসলে কারো নাই। এটি একটি সাময়িক বিষয়। আওয়ামী লীগকে বাংলার জনগণই নিয়ে আসবে তাদের প্রয়োজনে, দেশের প্রয়োজনে ও জাতির প্রয়োজনে।
আওয়ামী লীগের ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত বলেছেন, "এর মাধ্যমে বিএনপিকে দেশের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহত্তম রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার পূর্ণ দায় নিতে হবে এবং ভবিষ্যতে এর ফলে যে পরিণতি হবে, তা বিএনপিকেই ভোগ করতে হবে"।
তার বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, "ভুলে গেলে চলবে না যে আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ে এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে যে ব্যাপক সমর্থন রয়েছে, তা অত্যন্ত শক্তিশালী। মনে রাখবেন, জনমত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং এই পরিবর্তন ইতোমধ্যেই আরও তীব্র হতে শুরু করেছে।
এই বাস্তবতায় আওয়ামী লীগ জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য সংগ্রাম করার উচ্চতর নৈতিক অবস্থান অর্জন করবে। দেশকে স্বৈরাচারের কবল থেকে রক্ষা করার জন্য আওয়ামী লীগ দেশের জনগণকে সাথে নিয়েই লড়াই করবে"।
আওয়ামী লীগের ইতিহাস, বাঙালি জাতির গৌরবোজ্জ্বল অর্জন ও সংগ্রামের ইতিহাস। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাসহ বাঙালি জাতির যা কিছু শ্রেষ্ঠ অর্জন, তার মূলে রয়েছে জনগণের এই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব। জন্মলগ্ন থেকে এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শক্তির উৎস জনগণ, শক্তির উৎস সংগঠনের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।
১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পুরনো ঢাকার ঐতিহ্যবাহী রোজ গার্ডেনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এই রাজনৈতিক দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার সময় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কারাগারে আটক ছিলেন। তাঁকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করা হয়। কেন্দ্রীয়ভাবে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ করা হলেও পরবর্তী সময়ে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক আদর্শের অধিকতর প্রতিফলন ঘটানোর জন্য এর নাম ‘আওয়ামী লীগ’ করা হয়।
১৯৫৪ সালের নির্বাচনে বিজয়ের পর ১৯৫৫ সালে অনুষ্ঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগের কাউন্সিলে দলের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। আর ‘পূর্ব পাকিস্তান’ শব্দ দুইটি বাদ পড়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় থেকে। বাংলাদেশে স্বাধীনতা ঘোষণা করার পর থেকে প্রবাসী সরকারের সব কাগজপত্রে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নাম ব্যবহার শুরু হয়। ১৯৭০ সাল থেকে এই দলের নির্বাচনী প্রতীক নৌকা। পরবর্তী সময়ে দেশের অন্যতম প্রাচীন এই সংগঠনটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধসহ প্রতিটি গণতান্ত্রিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে এদেশের গণমানুষের সংগঠনে পরিণত হয়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বের জন্যই আওয়ামী লীগকে ’৭০-এর নির্বাচনে পূর্ব-বাংলার মানুষ তাদের মুক্তির ম্যান্ডেট দিয়েছিল। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই ভূখন্ডে প্রতিটি প্রাপ্তি ও অর্জন সবই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই হয়েছে। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, সব আন্দোলন সংগ্রামে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে বাংলাদেশ গঠনে সর্বোচ্চ ভূমিকা পালন করেছে আওয়ামী লীগ। স্বাধীনতার পর থেকে দেশ বিরোধীদের ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ধ্বংস্তুপ থেকে উঠে এসে স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে।
দীর্ঘ আট দশকের অভিযাত্রায় আওয়ামী লীগের ওপর বারবার আঘাত এসেছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত দুইবার দলটিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা এবং পরবর্তীতে কারাগারের অভ্যন্তরে জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পর আওয়ামী লীগ বলতে গেলে এক প্রকার নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়েছিল। স্বাধীনতা বিরোধী খুনীচক্র ভেবেছিল আওয়ামী লীগ আর কখনও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না এবং ক্ষমতায় আসতে পারবে না। কিন্তু তাদের সেই ভাবনাকে মিথ্যা প্রমাণ করে মাত্র ৫ বছরেই বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সূযোগ্য নেতৃত্বে দল আবারও সুসংগঠিত হয়ে ঠিকই ঘুরে দাঁড়ায় এবং স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে স্বৈরাচারের পতন ঘটায়। দীর্ঘ ২১ বছরের সংগ্রাম ও লড়াইয়ের পর ১৯৯৬ সালে ১২ জুনের নির্বাচনের মাধ্যমে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে আবারও ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলটি। তারপরের ইতিহাসতো দেশ ও বিশ্ববাসি দেখেছেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের পর জনগনের সমর্থন নিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে টানা তিনটি নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত অত্যন্ত সফলভাবে দেশ পরিচালনা করে দেশকে পৃথিবীর বুকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করে। কিন্তু দেশি-বিদেশি যড়ষন্ত্র অর্থাৎ মেটিকুলাস ডিজাইনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম এক বিতর্কিত অধ্যাদেশের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করে। তারই ধারাবাহিকতায় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার সেই অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তরিত করার উদ্যোগ নিয়েছে যাতে করে দেশের সবচেয়ে প্রাচীন ও জনপ্রিয় দলটি আর রাজনীতি করার সুযোগ না পায়।
বাঙালি জাতি, বাংলা ভাষা, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ অবিচ্ছেদ্য ও একই সূত্রে গাঁথা।এবং একে অপরের পরিপূরক। আওয়ামী লীগের প্রয়াত সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছিলেন আওয়ামী লীগ শুধু একটা রাজনৈতিক দল নয়। হাজারও শহীদের রক্ত, জাতির পিতার রক্ত, জাতীয় চার নেতার রক্ত, হাজার হাজার নেতাকর্মীর আত্মত্যাগ সব মিলিয়েই আওয়ামী লীগ। এই আওয়ামী লীগ শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়, এটা অনুভূতি। এই হাজারও বন্ধুর রক্ত, চার নেতার রক্ত, ভাষা আন্দোলনের রক্ত-সেই অনুভূতি। এই অনুভূতিতে সৃষ্টি হয়েছে আওয়ামী লীগ।
আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করার জন্য অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে, কিন্তু আওয়ামী লীগকে নিঃশেষ করতে পারেনি এবং কোনোদিনই পারবে না, কোনোদিনই পারবে না। জননেত্রী যতদিন আছেন, তিনিই দলের নেতৃত্ব দেবেন। কিন্তু এই জননেত্রী শেখ হাসিনা যদি না থাকেন, আওয়ামী লীগ কিন্তু মরবে না। কারণ আওয়ামী লীগ অজেয় রাজনৈতিক সংগঠন। আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকলে পৃথিবীর কোনো শক্তি নাই, এই আওয়ামী লীগকে স্তব্ধ করে দিতে পারে।
আওয়ামী লীগ কোন ভূঁইফোড় রাজনৈতিক দল নয় এবং ক্যান্টনমেন্টেও এই দলের জন্ম হয়নি। এই দলের প্রতিষ্ঠার পিছনে রয়েছে সংগ্রামী ইতিহাস এবং এই সেই দল যারা ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধসহ দেশের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে।
আওয়ামী লীগ হচ্ছে কিংবদন্তি রাজনীতিবিদ হুসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা ভাসানি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল হক, তাজউদ্দীন আহমেদের মতো নেতাদের হাতে গড়া দল এবং এই দলের শিকড় দেশের প্রতিটি গ্রাম ও মহল্লায় বিস্তৃত রয়েছে। যেই দলটি দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫০ ভাগ প্রতিনিধিত্ব করে এবং যে দলে রয়েছে কোটি কোটি ত্যাগী নেতা-কর্মী সেই দলকে কোন আইন দিয়ে নিষিদ্ধ করা যায় না এবং সম্ভবও নয়।
আওয়ামী লীগ হচ্ছে সেই ফিনিক্স পাখি, যার ছাই থেকেও পুনর্জন্ম নেয়ার ইতিহাস রয়েছে। তাই রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির প্ররোচনায় পড়ে বিএনপি সরকার আইনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার যে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা বিএনপির জন্য একদিন বুমেরাং হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সাজ্জাদ হোসেন সবুজ
সিনিয়র সাংবাদিক এবং ওয়াশিংটনস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের সাবেক প্রেস মিনিস্টার।



















